মধ্যপ্রদেশে বিষাক্ত মদে মৃত্যুমিছিল, সাগরে মৃত ১২! হাসপাতালে ৩০, গ্রেপ্তার ১৪
মধ্যপ্রদেশের সাগরে বিষাক্ত মদে মৃত্যুমিছিল। মৃত বেড়ে ১২, হাসপাতালে ৩০ জন। ঘটনায় ১৪ জন গ্রেপ্তার, একাধিক মদের দোকান সিল এবং তদন্তে উত্তরপ্রদেশের ললিতপুরের যোগের সন্দেহ।
মধ্যপ্রদেশে বিষাক্ত মদে মৃত্যুমিছিল, সাগরে মৃত বেড়ে ১২! হাসপাতালে ৩০ জন, গ্রেপ্তার ১৪

সাগর, ৭ সেপ্টেম্বর, ন্যাশনাল ডেস্ক ১ : মধ্যপ্রদেশের সাগর জেলায় বিষাক্ত বা ভেজাল মদ পানকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যেই এই ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১২ জনে দাঁড়িয়েছে। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় আরও প্রায় ২৫ থেকে ৩০ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গিয়েছে। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। কীভাবে এত বিপুল পরিমাণ ভেজাল মদ সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছল এবং এর পিছনে কারা রয়েছে, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করেছে প্রশাসন ও পুলিশ।
শনিবার রাত থেকেই অসুস্থতার সূত্রপাত
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, গত শনিবার রাতে সাগর জেলার বান্দা ব্লকের বরাইজ, ঘুঘর, নওরোজ-সহ বেশ কয়েকটি গ্রামের মানুষ মদ পান করার পর একে একে অসুস্থ হয়ে পড়তে শুরু করেন। অনেকের বমি, মাথা ঘোরা, পেটের সমস্যা-সহ একাধিক শারীরিক উপসর্গ দেখা দেয়।
পরিস্থিতি দ্রুত গুরুতর হয়ে ওঠায় অসুস্থদের স্থানীয় হাসপাতালগুলিতে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে কয়েকজনের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁদের উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র স্থানান্তর করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই একের পর এক মৃত্যুর খবর সামনে আসে। সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১২ হয়েছে।
১৪ জন গ্রেপ্তার, একাধিক মামলা দায়ের
এই ঘটনায় ইতিমধ্যেই পুলিশি অভিযান শুরু হয়েছে। পুলিশ তিনটি এফআইআর দায়ের করেছে, যেখানে মোট ৩০ জন অভিযুক্তের নাম রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। তাঁদের মধ্যে এখনও পর্যন্ত ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, অভিযুক্তদের মধ্যে বেশ কয়েকজন অবৈধ মদ ব্যবসা বা বুটলেগিংয়ের সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করে ভেজাল মদ তৈরির উৎস, সরবরাহকারী এবং বিক্রির নেটওয়ার্ক সম্পর্কে আরও তথ্য জানার চেষ্টা চলছে।
উত্তরপ্রদেশ থেকে এসেছিল ভেজাল মদ?
তদন্তে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে। প্রাথমিকভাবে পুলিশের সন্দেহ, এই বিষাক্ত মদের একটি বড় অংশ প্রতিবেশী রাজ্য উত্তরপ্রদেশের ললিতপুর এলাকা থেকে সরবরাহ করা হয়েছিল।
অভিযোগ, আসল ব্র্যান্ডের মদের বোতলের মতো দেখতে নকল বোতল ব্যবহার করে ভেজাল মদ বাজারে ছড়ানো হয়েছিল। শুধু তাই নয়, বৈধ লাইসেন্সধারী মদের দোকানের এজেন্টদের মাধ্যমেও ওই মদ সাধারণ ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল বলে তদন্তকারীদের সন্দেহ।
ফলে শুধু স্থানীয় বুটলেগারদের ভূমিকা নয়, গোটা সরবরাহ চক্রের সঙ্গে আর কারা জড়িত, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
আবগারি দফতর ও পুলিশের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা
ঘটনার পর প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। দায়িত্বে গাফিলতির অভিযোগে আবগারি দফতরের তিনজন কর্মকর্তা এবং দুই পুলিশকর্মীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে, বেআইনি মদ বিক্রি ও ভেজাল মদের কারবারের সঙ্গে যুক্ত কাউকেই রেয়াত করা হবে না। তদন্তে যাঁদের ভূমিকা সামনে আসবে, তাঁদের বিরুদ্ধেই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একাধিক মদের দোকান সিল
ঘটনার পর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে সংশ্লিষ্ট এলাকায় ৬ থেকে ৭টি মদের দোকান সিলগালা করা হয়েছে। ওই দোকানগুলিতে বিক্রি হওয়া মদের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়েছে।
মদের বোতল, লেবেল, ব্যাচ নম্বর এবং সরবরাহ সংক্রান্ত নথিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কোথা থেকে মদ এসেছে এবং কোন পথে তা গ্রামগুলিতে পৌঁছেছে, সেই গোটা চক্রের সন্ধান করছে তদন্তকারী দল।
গ্রামগুলিতে মেডিক্যাল ক্যাম্প
মৃত্যুর ঘটনা সামনে আসার পর প্রশাসন উপদ্রুত গ্রামগুলিতে মেডিক্যাল ক্যাম্প বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে। গত ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে যাঁরা মদ পান করেছেন, তাঁদের শারীরিক পরীক্ষা করানোর জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে আবেদন জানানো হয়েছে।
চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে সম্ভাব্য আক্রান্তদের চিহ্নিত করার পাশাপাশি অসুস্থ ব্যক্তিদের দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার উপরেও জোর দেওয়া হচ্ছে।
তদন্তে উঠে আসতে পারে আরও তথ্য
সাগরের এই ঘটনায় এখন মূল প্রশ্ন, এত মানুষের কাছে কীভাবে বিষাক্ত মদ পৌঁছল এবং স্থানীয় প্রশাসনের নজর এড়িয়ে এতদিন ধরে এই অবৈধ কারবার চলছিল কীভাবে। পুলিশ ইতিমধ্যেই গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে।
তদন্তকারীদের ধারণা, এর পিছনে একটি বড়সড় আন্তঃরাজ্য মদ সরবরাহ চক্র থাকতে পারে। সেই চক্রের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার পাশাপাশি উত্তরপ্রদেশের ললিতপুর থেকে সাগর পর্যন্ত মদের সরবরাহপথও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
একদিকে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১২, অন্যদিকে বহু মানুষ এখনও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন—সব মিলিয়ে সাগরের এই বিষাক্ত মদ-কাণ্ডে উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে। প্রশাসনের তদন্ত শেষ হলে ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং ভেজাল মদ সরবরাহের সম্পূর্ণ চিত্র আরও স্পষ্ট হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
