রাস্তায় থুতু-পান থেকে আবর্জনা, এবার ডিজিটাল জরিমানা! নতুন পরিচ্ছন্নতা বিধি বাংলায়
১ সেপ্টেম্বর থেকে পশ্চিমবঙ্গের পুরনিগম, পুরসভা ও নোটিফায়েড এলাকায় নতুন পরিচ্ছন্নতা বিধি কার্যকর। থুতু-পান, আবর্জনা, প্লাস্টিক ব্যবহারে জরিমানা, চালু ডিজিটাল পেমেন্ট ও Swachh App।
রাস্তায় থুতু-পান থেকে আবর্জনা—বাড়ল নজরদারি, শুরু ডিজিটাল জরিমানা

কলকাতা, স্টেট ডেস্ক ৮ : ‘স্বচ্ছ, সুন্দর, সুরক্ষিত বেঙ্গল’ গড়ার লক্ষ্যে রাজ্যজুড়ে পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থায় বড়সড় পরিবর্তন আনল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে রাজ্যের সমস্ত পুরনিগম, পুরসভা এবং নোটিফায়েড এরিয়ায় নতুন পরিচ্ছন্নতা বিধি ও ডিজিটাল জরিমানা আদায়ের ব্যবস্থা কার্যকর হয়েছে। শুধু জরিমানা আদায় নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যে পরিচ্ছন্নতা নিয়ে সচেতনতা বাড়ানো এবং জনসমক্ষে অপরিচ্ছন্নতা রুখতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শহর ও পুর এলাকায় রাস্তা, ফুটপাত, বাজার, গুরুত্বপূর্ণ মোড় এবং অন্যান্য জনবহুল জায়গায় নিয়ম ভাঙার প্রবণতা কমাতেই এই নতুন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে জরিমানা আদায়ের প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও সম্পূর্ণ নগদহীন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কোন কোন অপরাধে কত টাকা জরিমানা?
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, জনসমক্ষে অপরিচ্ছন্নতা ছড়ানোর বিভিন্ন ঘটনায় সরাসরি জরিমানা করা হবে।
জনসমক্ষে থুতু বা পানের পিক ফেললে দিতে হবে ১০০ টাকা জরিমানা।
রাস্তায় বা সাধারণ জায়গায় আবর্জনা কিংবা বর্জ্য ফেললে জরিমানা হবে ২০০ টাকা।
প্রকাশ্যে মল-মূত্র ত্যাগ করলে দিতে হবে ২০০ টাকা।
এছাড়াও ১২৫ মাইক্রনের কম পুরুত্বের নিষিদ্ধ প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহার করলেও ধার্য করা হয়েছে ২০০ টাকা জরিমানা।
শুধু আবর্জনা ফেলা বা প্লাস্টিক ব্যবহারের ক্ষেত্রেই নয়, বেআইনি পার্কিং, ফুটপাত দখল এবং রাস্তায় নির্মাণসামগ্রী ফেলে রাখার বিরুদ্ধেও কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে নিয়ম অনুযায়ী জরিমানা এবং প্রয়োজন হলে আইনি পদক্ষেপ করা হবে।
এবার আর নগদে জরিমানা নয়
নতুন ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল সম্পূর্ণ ক্যাশলেস জরিমানা আদায় ব্যবস্থা। অর্থাৎ রাস্তায় দাঁড়িয়ে কোনও নাগরিকের কাছ থেকে নগদ টাকা নেওয়ার সুযোগ থাকবে না।
পুরসভার অনুমোদিত আধিকারিক ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের হাতে থাকবে ডিজিটাল মেশিন। কেউ নিয়ম ভাঙলে তাঁর নাম ও মোবাইল নম্বর অ্যাপে নথিভুক্ত করা হবে। এরপর সিস্টেমের মাধ্যমে একটি QR কোড তৈরি হবে। সেই QR কোড স্ক্যান করে অনলাইনেই জরিমানার টাকা জমা দিতে হবে।
এর ফলে একদিকে যেমন নগদ লেনদেনের সম্ভাবনা কমবে, তেমনই জরিমানা আদায়ের পুরো প্রক্রিয়াটি ডিজিটাল রেকর্ডের আওতায় চলে আসবে।
‘Swachh App’-এ অভিযোগ জানাতে পারবেন সাধারণ মানুষ
পরিচ্ছন্নতা অভিযানকে শুধু পুরসভার কর্মীদের উপর নির্ভরশীল না রেখে সাধারণ মানুষকেও এর সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এজন্য চালু করা হয়েছে ‘Swachh App’।
কোনও নাগরিক যদি রাস্তায় আবর্জনা পড়ে থাকতে দেখেন, তাহলে অ্যাপের মাধ্যমে সেই জায়গার ছবি তুলে অভিযোগ জানাতে পারবেন। অভিযোগ পাওয়ার পর প্রশাসনের তরফে দ্রুত পদক্ষেপ করার পরিকল্পনা রয়েছে। নির্দিষ্ট ব্যবস্থায় দুই ঘণ্টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট জায়গা পরিষ্কার করার ব্যবস্থা করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে।
এর ফলে শহরের কোথায় আবর্জনা জমছে, কোথায় নিয়মিত পরিষ্কার হচ্ছে না—সেই সংক্রান্ত তথ্যও ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রশাসনের কাছে পৌঁছে যাবে।
বাড়ি বাড়ি বর্জ্য সংগ্রহেও QR কোড
পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থাকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর করতে বাড়ি বাড়ি বর্জ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রেও চালু করা হচ্ছে QR কোড ব্যবস্থা।
প্রতিটি বাড়িতে নির্দিষ্ট QR কোড বসানো হবে। প্রতিদিন সাফাইকর্মীরা বাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করার পর সেই কোড স্ক্যান করবেন। এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্মীর উপস্থিতি, বর্জ্য সংগ্রহের কাজ এবং পরিষেবা প্রদানের বিষয়টি ডিজিটালভাবে নথিভুক্ত করা সম্ভব হবে।
পুরসভা কর্তৃপক্ষের কাছে এর ফলে কোন এলাকায় নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ হচ্ছে এবং কোথায় পরিষেবায় ঘাটতি রয়েছে, তা পর্যবেক্ষণ করা আরও সহজ হবে।
প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে কাপড়ের ব্যাগ
প্লাস্টিক ব্যবহারে লাগাম টানতেও একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন বাজার এবং গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে কাপড়ের ব্যাগের ভেন্ডিং মেশিন বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যাতে সাধারণ মানুষ প্রয়োজনের সময় সহজেই প্লাস্টিকের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব ব্যাগ ব্যবহার করতে পারেন।
পাশাপাশি জনসমাগমপূর্ণ এলাকায় পর্যাপ্ত সংখ্যক ডাস্টবিন রাখার উপরও জোর দেওয়া হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতি ১০০ মিটার অন্তর ডাস্টবিন বসানোর কাজ চলছে।
শুধু জরিমানা নয়, সচেতনতা বৃদ্ধিই মূল লক্ষ্য
রাজ্য সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য শুধুমাত্র জরিমানা করে রাজস্ব সংগ্রহ করা নয়। বরং নাগরিকদের আচরণে পরিবর্তন আনা এবং জনসমক্ষে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার অভ্যাস তৈরি করাই বড় লক্ষ্য।
প্রশাসনের আশা, ডিজিটাল জরিমানা, নাগরিকদের অভিযোগ জানানোর অ্যাপ, QR কোডের মাধ্যমে বর্জ্য সংগ্রহের নজরদারি এবং পর্যাপ্ত ডাস্টবিন ও বিকল্প ব্যাগের ব্যবস্থা—এই সমস্ত পদক্ষেপ একসঙ্গে কার্যকর হলে শহর ও পুর এলাকার পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
এখন দেখার, নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে কতটা সচেতনতা তৈরি হয় এবং পুরসভাগুলি কতটা কার্যকরভাবে এই ডিজিটাল ব্যবস্থাকে বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারে। ‘স্বচ্ছ, সুন্দর, সুরক্ষিত বেঙ্গল’-এর লক্ষ্য পূরণে আগামী দিনে এই অভিযান আরও বিস্তৃত করার ইঙ্গিতও রয়েছে।
