পুজোর পরেই বাংলায় নতুন শিল্পনীতি, ২৭ অক্টোবর মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর প্রকাশের ইঙ্গিত
পুজোর পর বাংলায় নতুন শিল্পনীতি প্রকাশের ইঙ্গিত। জমি পুলিং, সরাসরি জমি কেনা, ₹১০০ কোটির বেশি বিনিয়োগে একজানলা ব্যবস্থা ও কর্মসংস্থানভিত্তিক ইনসেন্টিভে জোর।
পুজোর পরেই বাংলায় নতুন শিল্পনীতি প্রকাশের ইঙ্গিত শুভেন্দুর

কলকাতা, স্টেট ডেস্ক ১৪ : দুর্গাপূজার উৎসব মিটলেই পশ্চিমবঙ্গে নতুন শিল্পনীতির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হতে চলেছে। দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর রাজ্যের প্রস্তাবিত নতুন শিল্পনীতির খসড়া ইতিমধ্যেই মন্ত্রীগোষ্ঠী বা GoM-এর অনুমোদন পেয়েছে। এবার মুখ্যসচিবের পর্যালোচনার পর খসড়াটি মন্ত্রিসভার সামনে পেশ করা হবে। সর্বশেষ আপডেট অনুযায়ী, আগামী ২৭ অক্টোবর মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর নতুন শিল্পনীতি প্রকাশ করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
এর আগে নতুন শিল্পনীতি দুর্গাপূজার আগেই ঘোষণা করার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পর সরকার এখন পুজোর পরেই নীতি প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারের যুক্তি, পুজোর সময় একাধিক প্রশাসনিক ও সরকারি কর্মসূচি থাকায় তাড়াহুড়ো করে নীতি ঘোষণা না করে সমস্ত বিষয় খতিয়ে দেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
জমি জোগাড়ে নতুন মডেলের উপর জোর
নতুন শিল্পনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে চলেছে শিল্পের জন্য জমির সহজলভ্যতা। শিল্প গড়তে জমি অধিগ্রহণের পরিবর্তে ল্যান্ড পুলিং এবং সরাসরি জমি কেনার মডেলকে গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারি সূত্রে আলোচনায় এসেছে, বিভিন্ন জমির মালিকের কাছ থেকে জমি একত্রিত করে শিল্পের জন্য ব্যবহারযোগ্য জমির ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী সরকার সরাসরি জমির মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে জমি কিনে তা শিল্পসংস্থার হাতে তুলে দেওয়ার ব্যবস্থাও করতে পারে।
জমি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের অতীত অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রেখেই জমির মালিক, কৃষক, বর্গাদার এবং শিল্পসংস্থার স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানা যাচ্ছে।
১০০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগে একজানলা ব্যবস্থা
বড় বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর লক্ষ্যেও বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা রয়েছে। ১০০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগকারী শিল্পসংস্থার জন্য সিঙ্গেল উইন্ডো বা একজানলা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এর ফলে জমি, লাইসেন্স, অনুমোদন-সহ বিভিন্ন সরকারি ছাড়পত্রের জন্য একাধিক দফতরে আলাদাভাবে ঘুরতে হবে না। বড় শিল্পপ্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থাকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চাকরি তৈরি করলেই মিলবে ইনসেন্টিভ
নতুন শিল্পনীতিতে বিনিয়োগের পরিমাণের পাশাপাশি কত কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে, তার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ কোনও শিল্পসংস্থা রাজ্যে কত টাকা বিনিয়োগ করছে, তার পাশাপাশি সেই বিনিয়োগের মাধ্যমে কত মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে, তা ইনসেন্টিভ দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এই কর্মসংস্থানভিত্তিক শিল্প-উৎসাহ প্রকল্পের জন্য রাজ্য বাজেটে প্রায় ৫,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা আগেই জানানো হয়েছিল। সরকারের লক্ষ্য, শিল্প বিনিয়োগের পাশাপাশি রাজ্যের যুবসমাজের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা।
বন্ধ ও অব্যবহৃত শিল্পজমি ফের ব্যবহারের পরিকল্পনা
নতুন শিল্পনীতিতে রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ হয়ে থাকা বা অব্যবহৃত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জমিকে নতুন করে কাজে লাগানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। ইতিমধ্যেই পুরনো শিল্পপার্ক ও অব্যবহৃত শিল্পজমির পর্যালোচনা করে সেখানে নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার কাজ শুরু হয়েছে।
এছাড়াও বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থার অব্যবহৃত জমি একত্রিত করে শিল্পের জন্য একটি কার্যকর ল্যান্ড ব্যাঙ্ক তৈরির বিষয়েও আলোচনা চলছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
নতুন প্রযুক্তি ও MSME-তেও নজর
শুধু প্রচলিত শিল্প নয়, নতুন শিল্পনীতিতে MSME, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI, সেমিকন্ডাক্টর এবং ডেটা সেন্টার-এর মতো উদীয়মান ক্ষেত্রগুলিকেও গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর পাশাপাশি রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী শিল্পগুলির উন্নয়ন এবং নতুন বিনিয়োগ টানার উপরও জোর দেওয়া হচ্ছে।
GoM-এর অনুমোদিত খসড়ায় রাজ্যে নিবন্ধিত অফিস থাকা সংস্থাগুলির জন্য বিশেষ ইনসেন্টিভের বিষয়টিও রয়েছে বলে শিল্প দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে। পূর্ববর্তী সরকারের সময় বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প-ইনসেন্টিভের বকেয়া অর্থ ধাপে ধাপে মেটানোর বিষয়েও আলোচনা চলছে, যেখানে MSME-গুলিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা রয়েছে।
বড় বিনিয়োগ টানাই মূল লক্ষ্য
নতুন শিল্পনীতির মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গে দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোই সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। জমির সমস্যা দূর করা, দ্রুত সরকারি অনুমোদন, কর্মসংস্থানভিত্তিক আর্থিক সুবিধা এবং নতুন প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পকে উৎসাহ দেওয়ার মাধ্যমে রাজ্যে একটি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি ৩৩টি শিল্পপ্রকল্পের জন্য প্রায় ৫৮০ একর জমি বরাদ্দ করা হয়েছে। এই প্রকল্পগুলিতে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ এবং ৬২ হাজারের বেশি কর্মসংস্থানের সম্ভাবনার কথা জানানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে পুজোর পর প্রকাশিত হতে চলা নতুন শিল্পনীতি পশ্চিমবঙ্গের শিল্পায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। এখন নজর আগামী ২৭ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার বৈঠকের দিকে—সেখানেই চূড়ান্ত অনুমোদনের পর নতুন শিল্পনীতির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
