কোচবিহার পাক-চরকাণ্ডে নতুন মোড়, দিল্লি থেকে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার গ্রেপ্তার
কোচবিহার সীমান্তে পাক-চর সন্দেহে গ্রেপ্তারকাণ্ডে নতুন মোড়। দিল্লি থেকে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার প্রদীপ্ত বসুকে গ্রেপ্তার করেছে STF। তদন্তে উঠে আসছে সিম পাচার, আর্থিক লেনদেন ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের তথ্য।
সীমান্ত পাক- চর সন্দেহে নতুন মোড়, দিল্লি থেকে গ্রেপ্তার সফট্ওয়ার ইইঞ্জিনিয়ার
কোচবিহার, সিটি নিউজ বাংলা, ডিস্ট্রিক্ট ডেস্ক : কোচবিহারের দিনহাটা ও সংলগ্ন সীমান্ত এলাকা থেকে পাকিস্তানি গুপ্তচরচক্রের সঙ্গে যুক্ত থাকার সন্দেহে একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের পর তদন্তে এবার নতুন মোড়। দিল্লি থেকে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার প্রদীপ্ত বসুকে গ্রেপ্তার করেছে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স বা STF। ট্রানজিট রিমান্ডে তাঁকে কোচবিহারে নিয়ে এসে আদালতে পেশ করা হয়েছে। বর্তমানে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে গোটা নেটওয়ার্কের সঙ্গে তাঁর যোগসূত্র খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।

স্বাধীনতা দিবসের আগে ও পরে কোচবিহারের দিনহাটা এবং সংলগ্ন সীমান্ত এলাকায় একাধিক ব্যক্তিকে পাকিস্তানি চর সন্দেহে গ্রেপ্তার করার পর থেকেই তদন্তে একের পর এক নতুন তথ্য সামনে আসছে। ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করেই দিল্লিতে থাকা প্রদীপ্ত বসুর নাম তদন্তকারীদের হাতে আসে বলে সূত্রের খবর। এরপরই তাঁর গতিবিধির ওপর নজরদারি শুরু করে STF।
ধৃতদের জেরা করেই প্রদীপ্তের নাম
তদন্তকারীদের সূত্রে জানা গিয়েছে, দিনহাটা ও কোচবিহার এলাকায় গ্রেপ্তার হওয়া কয়েকজন যুবককে জিজ্ঞাসাবাদ করার সময় আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের একাধিক তথ্য সামনে আসে। সেই সূত্র ধরেই দিল্লিতে থাকা প্রদীপ্ত বসুর নাম উঠে আসে।
এরপর তাঁর সঙ্গে ধৃতদের যোগাযোগের ধরন, মোবাইল ফোনে কথাবার্তা, আর্থিক লেনদেন এবং বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়গুলি খতিয়ে দেখা হয়। প্রাথমিক তদন্তে সন্দেহজনক কিছু তথ্য পাওয়ার পর দিল্লিতে অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করে STF।
ভারতীয় সিম পাচারের অভিযোগ
তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠেছে ভারতীয় সিম কার্ড সংগ্রহ এবং তা বিদেশে পাচারের অভিযোগ। STF-এর সন্দেহ, এই চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন উপায়ে ভারতীয় সিম কার্ড সংগ্রহ করে তা বাংলাদেশ ও নেপাল হয়ে পাকিস্তানে পাচার করত।
অভিযোগ, ওই সিম কার্ড ব্যবহার করেই পাকিস্তানে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বিভিন্ন ধরনের তথ্য আদান-প্রদান করা হত। এই যোগাযোগের মাধ্যমে দেশের নিরাপত্তা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাচার করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
তবে এই সমস্ত অভিযোগের সত্যতা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। STF এখন ধৃত ব্যক্তিদের বক্তব্য, ডিজিটাল তথ্য এবং আর্থিক লেনদেনের সূত্র মিলিয়ে দেখছে।
ব্যবসার আড়ালে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক?
তদন্তে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে বলে জানা যাচ্ছে। প্রদীপ্ত বসু শিলিগুড়িতে একটি মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তদন্তকারীদের অনুমান, ওই ব্যবসার আড়ালেই কোনও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বা সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন চলত কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বিশেষ করে বিদেশি যোগাযোগ, বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে আর্থিক লেনদেন এবং সীমান্তপথে অর্থের গতিবিধির সঙ্গে তাঁর কোনও সম্পর্ক ছিল কি না, সেই বিষয়েও তদন্ত চলছে। মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসাকে ব্যবহার করে কোনও গোপন নেটওয়ার্ক পরিচালনা করা হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
কোচবিহার সীমান্তে নজরদারি বাড়ছে
স্বাধীনতা দিবসের আগে কোচবিহারের সীমান্ত এলাকায় একাধিক সন্দেহভাজন ব্যক্তির গ্রেপ্তারির পর গোটা বিষয়টি নিয়ে নিরাপত্তা সংস্থাগুলির মধ্যে তৎপরতা বেড়েছে। দিনহাটা ও সংলগ্ন সীমান্ত এলাকায় কারা নিয়মিত যাতায়াত করত, তাদের সঙ্গে বাংলাদেশ বা অন্য কোনও দেশের যোগাযোগ ছিল কি না এবং কোনও সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন হয়েছে কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্তকারীরা মনে করছেন, ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং ডিজিটাল ডিভাইস পরীক্ষা করে এই নেটওয়ার্কের আরও সদস্যের সন্ধান মিলতে পারে।
ডিজিটাল তথ্য খতিয়ে দেখছে STF
প্রদীপ্ত বসু সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হওয়ায় তাঁর প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং ডিজিটাল যোগাযোগও তদন্তকারীদের বিশেষ নজরে রয়েছে। মোবাইল ফোন, কম্পিউটার বা অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইসে কোনও সন্দেহজনক যোগাযোগ, এনক্রিপ্টেড বার্তা, বিদেশি নম্বরের সঙ্গে যোগাযোগ কিংবা আর্থিক লেনদেনের তথ্য রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্তকারীরা ধৃতদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগের ধরনও মিলিয়ে দেখছেন। কে কার সঙ্গে যোগাযোগ করতেন, কোথা থেকে নির্দেশ আসত এবং তথ্য বা অর্থ কীভাবে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পৌঁছত—এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতেই জিজ্ঞাসাবাদ চালানো হচ্ছে।
আদালতে পেশ, জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত
দিল্লি থেকে গ্রেপ্তারের পর ট্রানজিট রিমান্ডে প্রদীপ্ত বসুকে কোচবিহারে আনা হয়। এরপর তাঁকে আদালতে পেশ করা হয়েছে। বর্তমানে তাঁকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন STF-এর আধিকারিকরা।
প্রদীপ্তের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত আরও কেউ রয়েছে কি না, সীমান্তের বাইরে তাদের কোনও যোগাযোগ রয়েছে কি না এবং আর্থিক লেনদেনের প্রকৃত চরিত্র কী—সেসব বিষয়ের উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা।
কোচবিহারের সীমান্ত এলাকা থেকে শুরু হয়ে তদন্তের সূত্র দিল্লি এবং শিলিগুড়ি পর্যন্ত পৌঁছনোয় গোটা ঘটনায় চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। এখন STF-এর জিজ্ঞাসাবাদে এই সন্দেহভাজন নেটওয়ার্কের কতটা গভীরে পৌঁছনো যায় এবং আরও কোনও গুরুত্বপূর্ণ নাম সামনে আসে কি না, সেদিকেই নজর রয়েছে।
