৩২তম জাতীয় শিশু বিজ্ঞান কংগ্রেসের প্রশিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মশালা কোচবিহারে
কোচবিহারে সফলভাবে সম্পন্ন হল ৩২তম জাতীয় শিশু বিজ্ঞান কংগ্রেসের প্রশিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মশালা। অংশ নিলেন ৮০টিরও বেশি বিদ্যালয়ের গাইড টিচার।
সফলভাবে সম্পন্ন হল কোচবিহারে ৩২তম জাতীয় শিশু বিজ্ঞান কংগ্রেসের প্রশিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মশালা
কোচবিহার, ডিস্ট্রিক্ট ডেস্ক : বিজ্ঞানমনস্কতা গড়ে তোলা, ছাত্রছাত্রীদের গবেষণামুখী করে তোলা এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে বিজ্ঞানচর্চার আগ্রহ আরও বাড়ানোর লক্ষ্যে সফলভাবে সম্পন্ন হল ৩২তম জাতীয় শিশু বিজ্ঞান কংগ্রেসের জেলা পর্যায়ের প্রশিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মশালা। কোচবিহারের স্থানীয় জেমকিন স্কুলে আয়োজিত এই গুরুত্বপূর্ণ কর্মশালায় জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ৮০টিরও বেশি বিদ্যালয়ের গাইড টিচার অংশগ্রহণ করেন। সকাল ১১টা থেকে শুরু হয়ে বিকেল ৪টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত চলে দিনভর এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচি।

জাতীয় শিশু বিজ্ঞান কংগ্রেসের জেলা পর্যায়ের এই কর্মশালায় মূলত ছাত্রছাত্রীদের বিজ্ঞানভিত্তিক প্রকল্প তৈরির বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। একটি প্রকল্প কীভাবে তৈরি করতে হবে, কারা প্রকল্প তৈরি করতে পারবে, একটি ভালো ও সফল প্রকল্পের কী কী বৈশিষ্ট্য থাকা প্রয়োজন এবং প্রকল্প তৈরির সময় কোন কোন বিষয়ের দিকে নজর দিতে হবে—সেই সমস্ত বিষয় অত্যন্ত সহজ ও সুন্দরভাবে গাইড টিচারদের সামনে তুলে ধরা হয়।
এছাড়াও এবারের জাতীয় শিশু বিজ্ঞান কংগ্রেসের জন্য নির্ধারিত বিভিন্ন টপিক ও সাব-টপিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। ছাত্রছাত্রীরা কীভাবে নিজেদের চারপাশের পরিবেশ, দৈনন্দিন জীবন এবং স্থানীয় বিভিন্ন সমস্যা থেকে বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার বিষয় নির্বাচন করতে পারে, সেই বিষয়েও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রকল্পের বিষয় নির্বাচন থেকে শুরু করে তথ্য সংগ্রহ, পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ এবং চূড়ান্ত উপস্থাপনা—প্রতিটি ধাপ নিয়েই আলোচনা করেন প্রশিক্ষকরা।
এই কর্মশালা আয়োজনের ক্ষেত্রে সাপোর্টিং টিম হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে কোচবিহার অনাসৃষ্টি। সমগ্র অনুষ্ঠানটি সুষ্ঠুভাবে সঞ্চালনা করেন কোচবিহার অনাসৃষ্টির সভাপতি তথা একাডেমিক কমিটির সদস্যা শ্রীমতি রুমা দে। তাঁর সাবলীল সঞ্চালনায় কর্মশালার বিভিন্ন পর্ব সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়।
উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা
কর্মশালায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এআই অফ স্কুল, কোচবিহারের শ্রী বরুণ মজুমদার। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষক শ্রী মানস কর, মধ্যশিক্ষা পর্ষদের জেলা কনভেনার শিক্ষক শ্রী বাসক দেবনাথ এবং জেমকিন্স স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শ্রী সঞ্জয় ধর।
তাঁদের উপস্থিতি ও বক্তব্য কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষক-শিক্ষিকাদের উৎসাহিত করে। ছাত্রছাত্রীদের বিজ্ঞানচর্চায় আরও বেশি করে যুক্ত করার পাশাপাশি বিদ্যালয় স্তর থেকেই তাঁদের মধ্যে গবেষণার মানসিকতা তৈরি করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
একাডেমিক কো-অর্ডিনেটর ও জেলা কো-অর্ডিনেটরদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
এবারের জাতীয় শিশু বিজ্ঞান কংগ্রেসে কোচবিহার জেলার একাডেমিক কো-অর্ডিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বিশিষ্ট শিক্ষক শ্রী পলাশ নন্দী, শ্রী চিত্তরঞ্জন দত্ত, শ্রী কৃষ্ণেন্দু পাল এবং শ্রী রিপন বিশ্বাস। তাঁদের নেতৃত্বে জেলার বিভিন্ন বিদ্যালয় থেকে আসা বিজ্ঞানভিত্তিক প্রকল্পগুলিকে সঠিকভাবে প্রস্তুত ও মূল্যায়নের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হবে।
অন্যদিকে জেলা কো-অর্ডিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন শ্রী সুমন্ত সাহা। তাঁর সঙ্গে সহযোগী পার্টনার হিসেবে কাজ করছে কোচবিহার অনাসৃষ্টি। জেলা পর্যায়ে শিশু বিজ্ঞান কংগ্রেসের বিভিন্ন কর্মসূচিকে সফলভাবে বাস্তবায়িত করার ক্ষেত্রে এই সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করছেন আয়োজকরা।
শিশু বিজ্ঞানের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা KRP-দের
দিনভর চলা এই প্রশিক্ষণ কর্মশালায় শিশু বিজ্ঞানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন অভিজ্ঞ KRP-রা। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ডক্টর অমিতাভ চক্রবর্তী, ডক্টর তপন দাস, ডক্টর সৌমেন চক্রবর্তী, ডক্টর অনিরুদ্ধ বর্মন, অমিতাভ সরকার, রিপন বিশ্বাস, কৃষ্ণেন্দু পাল এবং অনুপম উপাধ্যায়।
অভিজ্ঞ প্রশিক্ষকরা প্রকল্প তৈরির ক্ষেত্রে ছাত্রছাত্রীদের কীভাবে সঠিকভাবে গাইড করতে হবে, কোন ধরনের প্রকল্পকে গুরুত্ব দেওয়া হবে এবং গবেষণার ক্ষেত্রে কীভাবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে—তা নিয়ে বিস্তারিত পরামর্শ দেন।
এক মাস পর জেলা পর্যায়ের মূল অনুষ্ঠান
জেলা একাডেমিক কো-অর্ডিনেটরদের অন্যতম শ্রী পলাশ নন্দী জানান, আগামী প্রায় এক মাসের মধ্যেই জাতীয় শিশু বিজ্ঞান কংগ্রেসের জেলা পর্যায়ের মূল অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। আজকের প্রশিক্ষণ কর্মশালার মাধ্যমে জেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ের গাইড টিচাররা প্রকল্প তৈরির বিষয়ে প্রয়োজনীয় ধারণা পেয়েছেন। ফলে এবার জেলা পর্যায়ে আরও ভালো মানের এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিজ্ঞানভিত্তিক প্রকল্প উঠে আসবে বলে তিনি আশাবাদী।
তাঁর আশা, বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সহযোগিতায় ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের আশপাশের বিভিন্ন সমস্যা ও সম্ভাবনাকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্লেষণ করে নতুন নতুন প্রকল্প তৈরি করবে। সেই প্রকল্পগুলির মধ্যে থেকে বেশ কিছু প্রকল্প জেলা পর্যায়ে ভালো ফল করবে এবং পরবর্তী পর্যায়ে রাজ্য ও জাতীয় স্তরেও কোচবিহারের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পাবে।
‘শিক্ষা জ্যোতি’ সম্মানে মনোনীত ডক্টর তপন দাসকে সংবর্ধনা
এদিনের অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী পর্বেই ছিল বিশেষ সম্মাননা পর্ব। ‘শিক্ষা জ্যোতি’ সম্মানের জন্য মনোনীত হওয়ায় বিশিষ্ট শিক্ষক তথা মাস্টার KRP ডক্টর তপন দাসকে শিশু বিজ্ঞান জেলা কমিটির পক্ষ থেকে সম্মাননা জ্ঞাপন করা হয়।
দীর্ঘদিন ধরে শিশু বিজ্ঞান কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত থেকে কোচবিহার জেলার ছাত্রছাত্রীদের বিজ্ঞানভিত্তিক প্রকল্প তৈরিতে উৎসাহিত করা এবং তাঁদের রাজ্য ও জাতীয় স্তরে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ডক্টর তপন দাসের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। তাঁর এই দীর্ঘদিনের অবদানকে স্বীকৃতি দিয়েই এই সম্মাননা প্রদান করা হয় বলে আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞানচর্চায় নতুন প্রজন্মকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য
৩২তম জাতীয় শিশু বিজ্ঞান কংগ্রেসের জেলা পর্যায়ের এই প্রশিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মশালা শুধুমাত্র একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি নয়, বরং কোচবিহারের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতা ও গবেষণার পরিবেশ গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। জেলার ৮০টিরও বেশি বিদ্যালয়ের গাইড টিচারের অংশগ্রহণ এই কর্মসূচির গুরুত্বকেই তুলে ধরেছে।
আয়োজকদের আশা, আজকের কর্মশালা থেকে প্রাপ্ত নির্দেশনা কাজে লাগিয়ে আগামী এক মাসের মধ্যে জেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীরা একাধিক নতুন ও অভিনব বিজ্ঞানভিত্তিক প্রকল্প তৈরি করবে। সেই প্রকল্পগুলির মধ্য থেকেই জেলা পর্যায়ে সেরা প্রকল্পগুলি উঠে আসবে এবং ভবিষ্যতে রাজ্য ও জাতীয় স্তরে কোচবিহারের মুখ উজ্জ্বল করবে।
শিক্ষক, প্রশিক্ষক, KRP, একাডেমিক কো-অর্ডিনেটর এবং ছাত্রছাত্রীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কোচবিহারে ৩২তম জাতীয় শিশু বিজ্ঞান কংগ্রেসকে ঘিরে ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে উৎসাহ ও উদ্দীপনা। আগামী জেলা পর্যায়ের মূল অনুষ্ঠানকে সামনে রেখে এখন নজর জেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে তৈরি হতে চলা নতুন নতুন বিজ্ঞান প্রকল্পের দিকে।:::
