জাত সুমারির প্রশ্নমালা বাতিলের দাবি, মোদিকে যৌথ চিঠি খাড়গে-রাহুলের
জাত সুমারির বর্তমান প্রশ্নমালা বাতিলের দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে যৌথ চিঠি দিলেন মল্লিকার্জুন খাড়গে ও রাহুল গান্ধী। OBC-সহ জাতভিত্তিক তথ্য সংগ্রহে নির্দিষ্ট তালিকার দাবি কংগ্রেসের।
জাত সুমারির প্রশ্নমালা বাতিলের দাবি, প্রধানমন্ত্রী মোদিকে যৌথ চিঠি খাড়গে-রাহুলের
নয়াদিল্লি, সিটি নিউজ বাংলা, ন্যাশনাল ডেস্ক ১৩ : আসন্ন জাত সুমারির (Caste Census) পদ্ধতি নিয়ে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে ফের সরব কংগ্রেস। বর্তমান প্রস্তাবিত জাত সুমারির প্রশ্নমালা বাতিল করে নতুন, স্বচ্ছ এবং তথ্যগতভাবে নির্ভুল রূপরেখা তৈরির দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে যৌথভাবে চিঠি দিলেন রাজ্যসভার বিরোধী দলনেতা মল্লিকার্জুন খাড়গে এবং লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী।

কংগ্রেসের অভিযোগ, কেন্দ্র যে পদ্ধতিতে জাত সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের পরিকল্পনা করছে, তা যথেষ্ট নির্ভুল নয়। বিরোধী দলের দাবি, বর্তমান প্রশ্নমালায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকায় ভবিষ্যতে সংগৃহীত তথ্যের গ্রহণযোগ্যতা এবং ব্যবহারযোগ্যতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। কংগ্রেসের পক্ষ থেকে কেন্দ্রের প্রস্তাবিত ব্যবস্থাকে কার্যত ‘লোকদেখানো’ বলেও সমালোচনা করা হয়েছে।
প্রশ্নমালার ‘ওপেন-এন্ডেড’ পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি
খাড়গে ও রাহুলের চিঠিতে সবচেয়ে বড় আপত্তি তোলা হয়েছে জাতের নাম সংগ্রহের পদ্ধতি নিয়ে। তাঁদের দাবি, বর্তমান প্রশ্নমালায় জাতের নাম বেছে নেওয়ার জন্য কোনও নির্দিষ্ট বা পূর্বনির্ধারিত ড্রপ-ডাউন তালিকা রাখা হয়নি।
এর ফলে একজন উত্তরদাতা নিজের জাতের নাম যে ভাবে লিখবেন বা জানাবেন, সেটিই আলাদাভাবে নথিভুক্ত হতে পারে। বিরোধী নেতাদের আশঙ্কা, একই জাতির বিভিন্ন বানান, আঞ্চলিক নাম, উপগোষ্ঠী কিংবা প্রচলিত ভিন্ন নামের কারণে একই জনগোষ্ঠী একাধিক পৃথক শ্রেণিতে বিভক্ত হয়ে যেতে পারে।
তথ্যের নির্ভুলতা নিয়ে বড় আশঙ্কা
কংগ্রেসের যুক্তি, জাতের নাম সংগ্রহে এই ধরনের উন্মুক্ত পদ্ধতি ব্যবহার করা হলে বিপুল সংখ্যক পৃথক নাম উঠে আসতে পারে। একই জাতির মানুষ বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন নামে পরিচিত হলে সেই নামগুলি পৃথক তথ্য হিসেবে গণ্য হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।
এর ফলে জাতভিত্তিক জনসংখ্যার প্রকৃত চিত্র পাওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে। শুধু তাই নয়, সংগৃহীত তথ্যের সঙ্গে পুরনো জনগণনা বা আর্থ-সামাজিক ও জাতি সংক্রান্ত পূর্ববর্তী তথ্যের তুলনা করাও সমস্যাজনক হয়ে উঠতে পারে বলে দাবি বিরোধীদের।
OBC জনগোষ্ঠীর সংখ্যা নিয়ে উদ্বেগ
খাড়গে ও রাহুলের চিঠিতে বিশেষভাবে ওবিসি বা অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির জনগোষ্ঠীর বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, প্রশ্নমালায় ‘অনগ্রসর শ্রেণী’ বা ‘Backward Class’-এর মতো নির্দিষ্ট শ্রেণিবিন্যাস স্পষ্টভাবে না থাকলে দেশের ওবিসি জনগোষ্ঠীর প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন হতে পারে।
কংগ্রেসের দাবি, জাতভিত্তিক নির্ভুল তথ্য শুধু পরিসংখ্যানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়। সরকারি চাকরিতে সংরক্ষণ, শিক্ষাক্ষেত্রে সুযোগ, বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প এবং উন্নয়নমূলক পরিকল্পনা তৈরির ক্ষেত্রেও এই তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তাই ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে নীতি তৈরি হলে তার প্রভাব পড়তে পারে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উপর।
ড্রপ-ডাউন তালিকার দাবি কংগ্রেসের
এই সমস্যার সমাধানে কংগ্রেসের পক্ষ থেকে একটি পূর্বনির্ধারিত এবং যাচাই করা জাতের তালিকা তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তপশিলি জাতি বা SC এবং তপশিলি উপজাতি বা ST-এর ক্ষেত্রে যেমন নির্দিষ্ট তালিকা রয়েছে, একইভাবে OBC এবং অন্যান্য জাতির ক্ষেত্রেও যাচাই করা তালিকা তৈরি করে প্রশ্নমালায় তা অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানানো হয়েছে।
কংগ্রেসের মতে, এতে একই জাতির বিভিন্ন নাম বা বানানের কারণে তথ্য বিভ্রাটের সম্ভাবনা অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে। একইসঙ্গে জাতভিত্তিক পরিসংখ্যানও আরও নির্ভরযোগ্যভাবে তৈরি করা যাবে।
বিহার ও তেলেঙ্গানার মডেলের উল্লেখ
চিঠিতে বিহার ও তেলেঙ্গানা সরকারের জাত সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। কংগ্রেসের দাবি, এই দুই রাজ্যে পূর্বপ্রস্তুত জাতের তালিকা ব্যবহার করে তথ্য সংগ্রহের যে মডেল অনুসরণ করা হয়েছে, তা পর্যালোচনা করে কেন্দ্রও একই ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।
বিরোধী নেতাদের মতে, দেশের মতো বিশাল এবং বৈচিত্র্যময় জনসংখ্যার ক্ষেত্রে জাতের তথ্য সংগ্রহ অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জটিল বিষয়। তাই তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতিতে সামান্য ভুলও পরবর্তী সময়ে বড় ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।
রাজনৈতিক দল ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনার দাবি
শুধু প্রশ্নমালা বাতিলের দাবিতেই থেমে থাকেনি কংগ্রেস। নতুন প্রশ্নমালা তৈরির আগে রাজনৈতিক দল, জনগণ, সমাজবিজ্ঞানী, পরিসংখ্যানবিদ এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করারও দাবি জানানো হয়েছে।
কংগ্রেসের বক্তব্য, জাত সুমারির মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রক্রিয়া কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের একক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া উচিত নয়। বরং সমস্ত পক্ষের মতামত নিয়ে একটি স্বচ্ছ, বৈজ্ঞানিক এবং সর্বজনগ্রাহ্য পদ্ধতি তৈরি করা প্রয়োজন।
জাত সুমারি ঘিরে ফের রাজনৈতিক চাপানউতোর
জাত সুমারি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই কেন্দ্র ও বিরোধীদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। জাতভিত্তিক নির্ভুল তথ্য সংগ্রহকে সামাজিক ন্যায়বিচার এবং নীতিনির্ধারণের সঙ্গে যুক্ত করে দেখছে বিরোধী শিবির। অন্যদিকে কেন্দ্রের তরফে জাত সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগকে কীভাবে কার্যকর ও নির্ভুল করা যায়, তা নিয়ে প্রক্রিয়া এগোচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীকে খাড়গে ও রাহুলের যৌথ চিঠি জাত সুমারির পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও একবার সামনে নিয়ে এল। এখন কেন্দ্র এই আপত্তিগুলির পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্নমালায় কোনও পরিবর্তন আনে কি না, নাকি বর্তমান কাঠামোতেই জাত সুমারির প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যায়, সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।
