স্কুল নিয়োগ দুর্নীতিতে ‘রেট কার্ড’! ED-র চার্জশিটে ৬৩০ কোটির চাঞ্চল্যকর দাবি
স্কুল নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় ED-র সাপ্লিমেন্টারি চার্জশিটে ‘রেট কার্ড’-এর দাবি। গ্রুপ-সি ও ডি নিয়োগে ৬৩০.৪০ কোটি টাকার অপরাধলব্ধ অর্থের উল্লেখ।
স্কুল নিয়োগ দুর্নীতিতে ‘রেট কার্ড’! চার্জশিটে বিস্ফোরক দাবি ED-র
কলকাতা, সিটি নিউজ বাংলা ১৬ : পশ্চিমবঙ্গের বহুচর্চিত স্কুল নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় নতুন করে চাঞ্চল্য ছড়াল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ED-এর সাপ্লিমেন্টারি চার্জশিটে।
কলকাতার বিশেষ PMLA আদালতে তদন্তকারী সংস্থার জমা দেওয়া নতুন চার্জশিটে অযোগ্য প্রার্থীদের চাকরি পাইয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ‘রেট চার্ট’ বা ‘রেট কার্ড’ থাকার দাবি করা হয়েছে। তদন্তকারীদের দাবি অনুযায়ী, পদ অনুযায়ী চাকরির জন্য ঘুষের অঙ্ক নির্দিষ্ট ছিল এবং তা ১০ লক্ষ থেকে শুরু করে ২০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত পৌঁছত।

এই চার্জশিটে প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়, তাঁর ঘনিষ্ঠ অর্পিতা মুখোপাধ্যায়, বহিষ্কৃত তৃণমূল নেতা কুন্তল ঘোষ-সহ একাধিক ব্যক্তি ও কথিত মিডলম্যানের নাম উঠে এসেছে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় টাকা লেনদেন এবং অযোগ্য প্রার্থীদের চাকরি পাইয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি সংগঠিত চক্র কাজ করেছিল বলেই তদন্তে উঠে এসেছে বলে দাবি ED-এর।
পদ অনুযায়ী নির্দিষ্ট ছিল ঘুষের টাকা
ED-এর দাবি অনুযায়ী, চাকরির পদের গুরুত্বের ভিত্তিতে অযোগ্য প্রার্থীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হতো। তদন্তে উঠে আসা তথ্যে গ্রুপ-ডি এবং গ্রুপ-সি পদের জন্য পৃথক ঘুষের অঙ্ক নির্ধারিত থাকার কথা বলা হয়েছে।
তদন্তকারী সংস্থার দাবি, গ্রুপ-ডি পদে চাকরির জন্য ১০ থেকে ১২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হতো। অন্যদিকে, তুলনামূলকভাবে উচ্চতর গ্রুপ-সি পদের ক্ষেত্রে ১৫ থেকে ১৬ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
সব মিলিয়ে বিভিন্ন পদের ক্ষেত্রে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার জন্য ঘুষের অঙ্ক ১০ লক্ষ থেকে ২০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত নির্দিষ্ট ছিল বলে চার্জশিটে দাবি করা হয়েছে। এই ‘রেট কার্ড’-এর উল্লেখই নতুন করে মামলার তদন্তে বিশেষ তাৎপর্য তৈরি করেছে।
৬৩০ কোটিরও বেশি অপরাধলব্ধ অর্থের দাবি
স্কুল নিয়োগ দুর্নীতির আর্থিক দিক নিয়েও চার্জশিটে বিস্ফোরক তথ্য তুলে ধরেছে ED। তদন্তকারী সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, শুধুমাত্র গ্রুপ-সি এবং গ্রুপ-ডি নিয়োগের ক্ষেত্রেই ন্যূনতম ৬৩০.৪০ কোটি টাকা অপরাধলব্ধ অর্থ বা Proceeds of Crime হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ওএমআর শিট এবং নিয়োগ সংক্রান্ত বিভিন্ন নথি খতিয়ে দেখে এই হিসাব করা হয়েছে বলে তদন্তকারী সংস্থার দাবি। অর্থাৎ নিয়োগ দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থের লেনদেন হয়েছিল এবং তার একটি অংশ বিভিন্ন ব্যক্তি ও মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলেও তদন্তে উঠে এসেছে।
কীভাবে চলত নিয়োগ দুর্নীতির কারবার?
ED-এর তদন্ত অনুযায়ী, গোটা নিয়োগ প্রক্রিয়ায় একাধিক স্তরে অনিয়ম করা হয়েছিল। যোগ্য প্রার্থীদের বঞ্চিত করে অযোগ্য প্রার্থীদের তালিকায় উপরে তুলে আনার জন্য বিভিন্ন বেআইনি পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছিল বলে অভিযোগ।
তদন্তে উঠে আসা অভিযোগগুলির মধ্যে রয়েছে, কিছু প্রার্থীর OMR শিট ইচ্ছাকৃতভাবে খালি রাখা হতো এবং পরবর্তী সময়ে সেখানে নম্বর বসানো হতো। এর ফলে পরীক্ষায় প্রকৃতপক্ষে কম নম্বর পাওয়া প্রার্থীও মেধাতালিকায় জায়গা করে নেওয়ার সুযোগ পেতেন বলে দাবি তদন্তকারীদের।
‘র্যাঙ্ক জাম্পিং’-এর অভিযোগ
নিয়োগ দুর্নীতির ক্ষেত্রে ‘র্যাঙ্ক জাম্পিং’-এর অভিযোগও চার্জশিটে গুরুত্বপূর্ণভাবে উঠে এসেছে। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, নিয়ম মেনে মেধাতালিকা তৈরি না করে নির্দিষ্ট প্রার্থীদের ইচ্ছাকৃতভাবে উপরে তুলে দেওয়া হতো।
এর ফলে যোগ্য প্রার্থীরা পিছিয়ে যেতেন এবং টাকা দিয়ে চাকরি পাওয়ার অভিযোগ থাকা প্রার্থীরা মেধাতালিকায় অস্বাভাবিকভাবে উপরের দিকে উঠে আসতেন বলে ED-এর দাবি।
প্যানেলের মেয়াদ শেষের পরেও সুপারিশপত্র?
তদন্তে আরও একটি গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। ED-এর দাবি, প্যানেলের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও কিছু ক্ষেত্রে পিছনের তারিখ দেখিয়ে বা ব্যাকডেটেড সুপারিশপত্র দেওয়া হয়েছিল।
এই পদ্ধতির মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নিয়মের বাইরে গিয়ে নির্দিষ্ট প্রার্থীদের সুবিধা করে দেওয়া হয়েছিল বলে তদন্তকারী সংস্থার অভিযোগ। ফলে গোটা নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং বৈধতা নিয়ে আরও বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
চার্জশিটে একাধিক পরিচিত নাম
নতুন সাপ্লিমেন্টারি চার্জশিটে মামলার সঙ্গে যুক্ত একাধিক পরিচিত ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেছে ED। এর মধ্যে রয়েছেন প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়, অর্পিতা মুখোপাধ্যায় এবং বহিষ্কৃত তৃণমূল নেতা কুন্তল ঘোষ-সহ একাধিক কথিত মধ্যস্থতাকারী।
তদন্তকারী সংস্থার দাবি, নিয়োগ দুর্নীতির অর্থ সংগ্রহ, তা বিভিন্ন মাধ্যমে সরানো এবং বেআইনি সম্পত্তি তৈরির ক্ষেত্রে একাধিক ব্যক্তি বিভিন্ন স্তরে ভূমিকা পালন করেছিলেন।
কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি ও নগদ অর্থ বাজেয়াপ্ত
নিয়োগ দুর্নীতির তদন্তের পাশাপাশি আর্থিক সম্পদের উৎসও খতিয়ে দেখছে ED। তদন্তের বিভিন্ন পর্যায়ে কোটি কোটি টাকার নগদ অর্থ, সম্পত্তি এবং অন্যান্য সম্পদ ফ্রিজ বা অ্যাটাচ করা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
তদন্তকারী সংস্থার মূল লক্ষ্য হল, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ কোথায় গিয়েছে এবং সেই অর্থ দিয়ে কী ধরনের সম্পত্তি বা অন্যান্য সম্পদ তৈরি করা হয়েছে, তা চিহ্নিত করা।
নতুন চার্জশিটে ফের তীব্র রাজনৈতিক ও আইনি চাপ
স্কুল নিয়োগ দুর্নীতি মামলা দীর্ঘদিন ধরেই রাজ্য রাজনীতির অন্যতম বড় ইস্যু। এবার ED-এর সাপ্লিমেন্টারি চার্জশিটে কথিত ‘রেট কার্ড’, বিপুল পরিমাণ অপরাধলব্ধ অর্থ এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় একাধিক স্তরের অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসায় মামলাটি ফের আলোচনার কেন্দ্রে।
তবে চার্জশিটে তদন্তকারী সংস্থার করা অভিযোগগুলির চূড়ান্ত সত্যতা বিচারাধীন এবং আদালতের পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়াতেই তার নিষ্পত্তি হবে। এখন নজর বিশেষ PMLA আদালতে মামলার পরবর্তী শুনানি এবং চার্জশিটে ওঠা অভিযোগগুলির বিরুদ্ধে অভিযুক্তদের আইনি অবস্থানের দিকে।
