বিয়েবাড়িতে মার্কিন হামলায় শিশুসহ প্রাণহানি, পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র-ড্রোন হামলা ইরানের
দক্ষিণ ইরানে বিয়ের অনুষ্ঠানে মার্কিন হামলার টুকরো পড়ে শিশুসহ অন্তত ৫ জনের মৃত্যু ও বহু আহতের অভিযোগ। পাল্টা জর্ডান, বাহরাইন ও ইরাকে মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র-ড্রোন হামলা ইরানের।
বিয়েবাড়িতে মার্কিন হামলায় শিশুসহ প্রাণহানি, পাল্টা জবাব ইরানের!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, ৬ : ফের ভয়াবহ সংঘাতের মুখে মধ্যপ্রাচ্য। দক্ষিণ ইরানের হরমোজগান প্রদেশের সিরিক কাউন্টির কুহেস্তাক এলাকায় একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে মার্কিন হামলার টুকরো এসে পড়ায় শিশুসহ একাধিক মানুষের মৃত্যু এবং বহু মানুষের আহত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনার পরই পাল্টা আঘাতে নামে ইরান। ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর বা IRGC জর্ডান, বাহরাইন ও ইরাকে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্বার্থ সংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে। কুয়েতও ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে।
বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলা, নিহত শিশুসহ অন্তত ৪-৫ জন
ইরানের রেড ক্রিসেন্টের দাবি অনুযায়ী, কুহেস্তাক শহরে একটি বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান চলছিল। সেই সময় মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলার টুকরো ওই আবাসিক এলাকায় আঘাত হানে। প্রাথমিকভাবে চারজনের মৃত্যুর কথা জানানো হলেও পরবর্তী স্থানীয় প্রতিবেদনে মৃতের সংখ্যা পাঁচজন বলা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে। আহত হয়েছেন ৫০ জনেরও বেশি মানুষ। সিরিকের গভর্নরের দেওয়া পরবর্তী হিসাবে আহতের সংখ্যা ৬৩ জন পর্যন্ত পৌঁছেছে বলে আল-জাজিরা জানিয়েছে।
হামলার পর ঘটনাস্থলে ব্যাপক ধ্বংসস্তূপ ছড়িয়ে পড়ে। আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে নিকটবর্তী মিনাব শহরের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। স্থানীয় প্রশাসনের দাবি, আহতদের মধ্যে বহু মহিলা ও শিশু রয়েছেন।
ইরানের অভিযোগ, এই হামলায় সাধারণ মানুষের বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তাদের হামলার লক্ষ্য ছিল ইরানের সামরিক অবকাঠামো, যার মধ্যে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সমুদ্রপথে হামলার সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত স্থাপনা ছিল। মার্কিন পক্ষ আরও জানিয়েছে, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে সাধারণ নাগরিকদের লক্ষ্য করে হামলা চালায় না।
পাল্টা হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র-ড্রোন
বিয়েবাড়িতে প্রাণহানির অভিযোগের পর ইরান পাল্টা সামরিক অভিযান শুরু করে। IRGC-এর দাবি, জর্ডান, বাহরাইন ও ইরাকে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও মার্কিন স্বার্থ সংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন পাঠানো হয়েছে।
জর্ডানের আকাশসীমায় একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঢোকার খবর পাওয়া যায়। জর্ডানের সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, তারা ১৩টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। একইসঙ্গে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় বিমান হামলার সাইরেনও বেজে ওঠে।
বাহরাইনও জানিয়েছে, তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানের বেশ কয়েকটি আকাশপথের হামলা প্রতিহত ও ধ্বংস করেছে। অন্যদিকে কুয়েতের সামরিক কর্তৃপক্ষ ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে।
হরমুজ প্রণালী ঘিরে আরও বাড়ছে উত্তেজনা
এই সংঘাতের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহণ পথ হিসেবে পরিচিত এই জলপথকে ঘিরে ইতিমধ্যেই ব্যাপক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক সামরিক সংঘর্ষের পাশাপাশি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। এর প্রভাব আন্তর্জাতিক তেলের বাজারেও পড়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ এবং মার্কিন সেনাদের বিরুদ্ধে ইরানি রেভলিউশনারি গার্ডের সাম্প্রতিক তৎপরতার জবাবেই নতুন করে ইরানে হামলা চালানো হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইরানের কর্মকাণ্ডের পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে হামলার যুক্তি তুলে ধরেছেন।
বেসামরিক প্রাণহানি নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
তবে সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার দাবি থাকলেও বিয়েবাড়ির ঘটনায় সাধারণ মানুষের মৃত্যু নতুন করে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ তৈরি করেছে। ইরানের কর্মকর্তারা ঘটনাটিকে বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা হিসেবে আখ্যা দিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তেহরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই ধরনের হামলার জবাব দেওয়া হবে।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রশাসনের বক্তব্য, তাদের সামরিক অভিযান ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও মার্কিন বাহিনী এবং আন্তর্জাতিক নৌপরিবহণের ওপর হুমকি মোকাবিলার লক্ষ্যেই পরিচালিত হয়েছে। ফলে দুই পক্ষের বক্তব্যের মধ্যে তীব্র বিরোধ দেখা দিয়েছে।
সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা
ইরান-আমেরিকার নতুন করে শুরু হওয়া এই পাল্টাপাল্টি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জর্ডান, বাহরাইন ও কুয়েতের মতো দেশগুলির আকাশসীমা ও সামরিক ঘাঁটি এই সংঘাতের প্রভাবের মধ্যে চলে আসায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
একদিকে ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা, অন্যদিকে মার্কিন বাহিনীর নতুন করে সামরিক অভিযান—দুইয়ের জেরে গোটা উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে। একইসঙ্গে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি পরিবহণ ব্যাহত হলে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ ও দামের ওপরও বড় প্রভাব পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির অভিযোগকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া পাল্টা সামরিক হামলা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে আরও ভয়াবহ পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতির দিকে এখন নজর গোটা বিশ্বের।
