SIR-এর খসড়া ভোটার তালিকায় ১৩.৩৭ কোটি নাম বাদ, দিল্লি-মহারাষ্ট্রে বড় পরিবর্তন
SIR-এর খসড়া ভোটার তালিকায় দেশজুড়ে ১৩.৩৭ কোটি নাম কমেছে। দিল্লিতে বাদ প্রায় ৪৭.৭ লাখ ও মহারাষ্ট্রে প্রায় ২.০৬ কোটি নাম। বিস্তারিত জানুন।
SIR-এর খসড়া ভোটার তালিকায় দেশজুড়ে ১৩.৩৭ কোটি নাম বাদ!

নয়াদিল্লি, ন্যাশনাল ডেস্ক ৫ : নির্বাচন কমিশনের Special Intensive Revision (SIR) বা বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধনকে ঘিরে দেশজুড়ে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। কমিশনের প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এখনও পর্যন্ত ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের খসড়া ভোটার তালিকায় প্রাক-SIR তালিকার তুলনায় প্রায় ১৩.৩৭ কোটি নাম কমে গিয়েছে, যা আগের তালিকার প্রায় ১৪.১ শতাংশ। দিল্লি ও মহারাষ্ট্রের খসড়া তালিকা প্রকাশের পর এই বিষয়টি আরও বেশি করে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।
দিল্লিতে বাদ প্রায় ৪৭.৭ লাখ নাম
শতাংশের বিচারে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা গিয়েছে রাজধানী দিল্লিতে। SIR-এর আগে দিল্লির ভোটার তালিকায় প্রায় ১.৪৫ কোটি নাম ছিল। খসড়া তালিকায় সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৭.৫৩ লাখে। অর্থাৎ প্রায় ৪৭.৭ লাখ ভোটারের নাম, বা মোট ভোটারের ৩২.৮ শতাংশ, খসড়া তালিকায় আর নেই।
এর অর্থ, দিল্লির প্রাক-SIR ভোটার তালিকার প্রায় প্রতি তিনজনের মধ্যে একজনের নাম বর্তমান খসড়া তালিকায় পাওয়া যাচ্ছে না। এই বিপুল পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র চাপানউতোর।
মহারাষ্ট্রে সংখ্যার বিচারে সবচেয়ে বড় বাদ
অন্যদিকে, মোট সংখ্যার বিচারে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হয়েছে মহারাষ্ট্রে। সেখানে SIR-এর আগে প্রায় ৯.৭৮ কোটি ভোটার থাকলেও খসড়া তালিকায় সংখ্যা কমে হয়েছে প্রায় ৭.৭১ কোটি। অর্থাৎ প্রায় ২.০৬ কোটি নাম বাদ পড়েছে, যা মোট ভোটারের প্রায় ২১.১ শতাংশ।
মহারাষ্ট্রের পাশাপাশি আরও কয়েকটি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলেই ভোটার তালিকায় উল্লেখযোগ্য হারে নাম কমেছে। ফলে SIR-এর মাধ্যমে ভোটার তালিকা কতটা বদলে যাচ্ছে, তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গেও বাদ পড়েছে বিপুল সংখ্যক নাম
পশ্চিমবঙ্গেও SIR-এর প্রভাব নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজ্যে প্রায় ৫৮.২ লাখ নাম, অর্থাৎ মোট ভোটার তালিকার প্রায় ১১ শতাংশ খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, খসড়া তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া মানেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি চূড়ান্তভাবে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে গিয়েছেন—এমনটা নয়। নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি ও আপত্তি জানিয়ে যোগ্য ভোটাররা নিজেদের নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ পাবেন।
কেন বাদ পড়ছে এত নাম?
নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী আধিকারিকদের বক্তব্য অনুযায়ী, SIR-এর উদ্দেশ্য হল ভোটার তালিকা যাচাই করে মৃত ব্যক্তি, স্থানান্তরিত ভোটার, অনুপস্থিত ভোটার এবং একাধিক জায়গায় থাকা একই ব্যক্তির নামের মতো অসঙ্গতি দূর করা।
বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের তথ্য যাচাই এবং এনুমেরেশন ফর্ম সংগ্রহের পর বিভিন্ন কারণে বহু নাম খসড়া তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এর মধ্যে অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে—
- স্থায়ীভাবে অন্যত্র চলে যাওয়া বা দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকা ভোটার।
- এনুমেরেশন ফর্ম সংগ্রহ বা জমা না পড়া।
- একাধিক জায়গায় একই ভোটারের নাম থাকা বা ডুপ্লিকেট এন্ট্রি।
- মৃত ভোটারের নাম পুরনো তালিকায় থেকে যাওয়া।
বিশেষ করে দিল্লি ও অন্যান্য বড় শহরে মানুষের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তরের হার বেশি হওয়ায় এই ধরনের বাদ পড়ার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হয়েছে।
‘ভোট চুরি’ অভিযোগ বিরোধীদের
SIR-এর খসড়া তালিকায় এত বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী এই প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে ‘ভোট চুরি’র অভিযোগ তুলেছেন। মহারাষ্ট্রের খসড়া তালিকা প্রকাশের পরও তিনি বিপুল সংখ্যক নাম বাদ যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের অভিযোগ করেছেন।
বিরোধীদের বক্তব্য, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে যদি প্রকৃত ও বৈধ ভোটারের নাম বাদ পড়ে যায়, তাহলে তা গণতান্ত্রিক অধিকার ও অবাধ নির্বাচনের ক্ষেত্রে বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে। একইসঙ্গে বাদ পড়া ভোটারদের সম্পূর্ণ তথ্য রাজনৈতিক দলগুলির সামনে স্বচ্ছভাবে তুলে ধরার দাবিও উঠেছে।
বিজেপির পাল্টা যুক্তি
অন্যদিকে, বিজেপি বিরোধীদের অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে। তাদের বক্তব্য, SIR কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত প্রক্রিয়া নয়; বরং ভোটার তালিকাকে আরও নির্ভুল করার জন্য নির্বাচন কমিশনের একটি প্রশাসনিক উদ্যোগ।
বিজেপির তরফে বলা হচ্ছে, বৈধ ভোটারদের নাম তালিকায় রাখার পাশাপাশি মৃত, স্থানান্তরিত ও ডুপ্লিকেট ভোটারদের নাম সরিয়ে ভোটার তালিকাকে পরিষ্কার করা জরুরি। একইসঙ্গে কারও নাম ভুলভাবে বাদ পড়ে থাকলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দাবি জানানোর সুযোগও রয়েছে।
নাম বাদ পড়লে কী করবেন ভোটাররা?
নির্বাচন কমিশন স্পষ্ট করেছে, খসড়া তালিকা চূড়ান্ত নয়। কারও নাম ভুলভাবে বাদ পড়ে থাকলে তিনি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি জানিয়ে নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার আবেদন করতে পারবেন।
দিল্লির ক্ষেত্রে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দাবি ও আপত্তি জানানোর সুযোগ রয়েছে। যোগ্য ভোটাররা প্রয়োজনীয় নথি-সহ Form 6 জমা দিয়ে নাম অন্তর্ভুক্তির আবেদন করতে পারবেন। অনলাইনের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ভোটার পরিষেবা কেন্দ্র বা Booth Level Officer-এর মাধ্যমেও আবেদন করার সুযোগ রয়েছে।
এরপর নির্বাচন আধিকারিকরা আবেদন ও নথিপত্র যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেবেন। সমস্ত দাবি ও আপত্তি নিষ্পত্তির পর দিল্লির চূড়ান্ত ভোটার তালিকা ৪ নভেম্বর প্রকাশের কথা রয়েছে।
খসড়া তালিকা নিয়ে বাড়ছে নজরদারি
SIR-এর মাধ্যমে ভোটার তালিকায় এত বড় পরিবর্তন হওয়ায় এখন নজর রয়েছে দাবি-আপত্তি পর্বের দিকে। কতজন বাদ পড়া ভোটার নিজেদের নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করতে পারবেন এবং যাচাইয়ের পর চূড়ান্ত তালিকায় কত নাম ফিরে আসবে—সেদিকেই তাকিয়ে রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষ।
নির্বাচন কমিশনের তরফে ভোটারদের নিজেদের নাম খসড়া তালিকায় রয়েছে কি না তা যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কমিশনের ভোটার পরিষেবা ব্যবস্থায় SIR-সংক্রান্ত ভোটার তালিকা ও নাম অনুসন্ধানের সুবিধাও রয়েছে।
সব মিলিয়ে, ১৩ কোটিরও বেশি নাম খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়ার ঘটনা দেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে বড় বিতর্ক তৈরি করেছে। একদিকে নির্বাচন কমিশনের দাবি—ভোটার তালিকা থেকে অসঙ্গতি দূর করে তালিকাকে নির্ভুল করাই SIR-এর উদ্দেশ্য; অন্যদিকে বিরোধীদের অভিযোগ—এই প্রক্রিয়ায় প্রকৃত ভোটারদের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এখন দাবি-আপত্তি পর্ব এবং চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পরই স্পষ্ট হবে, এই বিপুল সংখ্যক বাদ পড়া নামের কতগুলি প্রকৃতপক্ষে পুনরায় তালিকায় ফিরে আসে।নোট: আপনার দেওয়া তথ্যের সঙ্গে বর্তমান প্রকাশিত তথ্য মিলিয়ে সংবাদটি আপডেট করে লেখা হয়েছে—বিশেষ করে দিল্লিতে বাদ পড়া প্রায় ৪৭.৭ লাখ এবং মহারাষ্ট্রে প্রায় ২.০৬ কোটি নামের পরিসংখ্যানটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
