অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসে ‘রং যুদ্ধ’, গেরুয়া-সাদা বিতর্কে উত্তপ্ত কলকাতা
অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসের টিকিট কাউন্টারের রং ঘিরে বিজেপি, বাম ও সাংস্কৃতিক মহলে তীব্র বিতর্ক। গেরুয়া-সাদা রং নিয়ে কলকাতায় শুরু ‘রং যুদ্ধ’।
অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসে ‘রং যুদ্ধ’, গেরুয়া-সাদা বিতর্কে উত্তপ্ত কলকাতার সংস্কৃতি মহল
সিটি নিউজ বাংলা, স্টেট ডেস্ক: কলকাতার সাংস্কৃতিক মানচিত্রে অন্যতম পরিচিত নাম অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস। সেই প্রতিষ্ঠানের প্রবেশপথের টিকিট কাউন্টারের দেওয়ালের রং ঘিরে এবার সরাসরি রাজনৈতিক সংঘাতের ছবি সামনে এল। অল্প সময়ের ব্যবধানে একই দেওয়ালের রং বদলকে কেন্দ্র করে বিজেপি, বামপন্থী শিবির এবং নাট্য ও সাংস্কৃতিক মহলের মধ্যে শুরু হয়েছে তীব্র চাপানউতোর। ঘটনাকে ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের চেহারা নির্ধারণে রাজনৈতিক প্রভাব কতটা গ্রহণযোগ্য?

বিতর্কের সূত্রপাত জুলাইয়ের গোড়ায়। অভিযোগ ওঠে, অ্যাকাডেমির টিকিট কাউন্টারের একটি অংশে গেরুয়া রং করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ছবি-সহ একটি ব্যানারও সেখানে দেখা যায় বলে দাবি করা হয়। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতেই আপত্তি জানান শিল্পী, নাট্যকর্মী ও সাংস্কৃতিক জগতের একাংশ। তাঁদের বক্তব্য, কোনও রাজনৈতিক দলের রং, প্রতীক বা প্রচারের সঙ্গে অ্যাকাডেমির মতো ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করা উচিত নয়।
এরপর গত ১১ আগস্ট পরিস্থিতি অন্যদিকে মোড় নেয়। বামপন্থী আইনজীবী তথা প্রাক্তন সাংসদ বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য, নাট্যব্যক্তিত্ব চন্দন সেন, কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়-সহ কয়েকজন শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীর উপস্থিতিতে ওই দেওয়াল সাদা রং করা হয়। তাঁদের বক্তব্য ছিল, রাজনৈতিক পরিচয়ের ছাপ সরিয়ে অ্যাকাডেমির সাংস্কৃতিক পরিবেশ ও ঐতিহ্যকে অক্ষুণ্ণ রাখাই এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য।
কিন্তু সেই রং বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। অভিযোগ, মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই বিজেপি বিধায়ক তথা অভিনেতা রুদ্রনীল ঘোষের নেতৃত্বে বিজেপি কর্মীরা সেখানে পৌঁছে সাদা দেওয়ালের উপর ফের গেরুয়া রং করে দেন। সেই সময় ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগানও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে একটি দেওয়ালের রং ঘিরে তৈরি বিতর্ক দ্রুত রাজনৈতিক সংঘাতের রূপ নেয়।
রুদ্রনীল ঘোষের যুক্তি, অ্যাকাডেমির পুরনো ছবিতে টিকিট কাউন্টারের দেওয়ালে গেরুয়া ও চকোলেট রঙের বর্ডার দেখা যায়। তাঁর দাবি, পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই সেই রং পরিবর্তন করা হয়েছিল। অন্যদিকে বামপন্থী শিবির ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের দাবি, অ্যাকাডেমির ঐতিহ্যবাহী রঙের সঙ্গে গেরুয়া রাজনৈতিক পরিচয়কে জুড়ে দেওয়ার চেষ্টা ঠিক নয়। তাঁদের বক্তব্য, ভবনের আদি রং টেরাকোটা বা মেটে লাল ঘরানার ছিল এবং সেটিই ঐতিহ্যের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বিষয়টি নিয়ে বিজেপির মধ্যেও অবশ্য একমত সুর শোনা যায়নি। দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য স্পষ্ট করেছেন, সর্বত্র গেরুয়া রং করার পক্ষপাতী নয় দল। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার গেরুয়া রং নিয়ে আপত্তির যুক্তি মানতে নারাজ। তাঁর বক্তব্য, ভারতের জাতীয় পতাকাতেও গেরুয়া রং রয়েছে। ফলে কোনও স্থানে গেরুয়া ব্যবহার হলেই তা রাজনৈতিক বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়।
বিতর্কে সরব হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসও। তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ বিজেপির পদক্ষেপের সমালোচনা করে দাবি করেছেন, তাঁদের দল ক্ষমতায় থাকাকালীন অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসের মতো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে তৃণমূলের নীল-সাদা রঙে রাঙানোর উদ্যোগ নেয়নি। তাঁর মতে, শিল্প ও সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠানকে দলীয় রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে রাখাই উচিত।
প্রায় ৯০ বছরের ঐতিহ্য বহন করা অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসকে ঘিরে তৈরি এই বিতর্ক তাই আর শুধুমাত্র একটি দেওয়ালের রঙের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক প্রতীক এবং ঐতিহ্য—এই তিনের সম্পর্ক নিয়েই নতুন করে শুরু হয়েছে বিতর্ক। কলকাতার শিল্পী ও নাট্য মহলে প্রশ্ন উঠছে, একটি প্রতিষ্ঠানের ঐতিহাসিক চরিত্র রক্ষা হবে, নাকি রাজনৈতিক রংয়ের টানাপোড়েনেই তার পরিচয় বারবার বদলাবে?
একটি টিকিট কাউন্টারের দেওয়াল শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠেছে বৃহত্তর রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের প্রতীক। আর সেই কারণেই কলকাতার সাংস্কৃতিক মহলে এই ঘটনাই এখন পরিচিত হচ্ছে ‘রং যুদ্ধ’ নামে।
