প্রেসিডেন্সি জেলে আফতাব আনসারির সেলে আইফোন-রাউটার! উদ্ধার একাধিক ডিভাইস ও নগদ টাকা
প্রেসিডেন্সি জেলে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আফতাব আনসারির সেল থেকে আইফোন, স্মার্টফোন, জিও রাউটার, সিমকার্ড, পেনড্রাইভসহ একাধিক ইলেকট্রনিক ডিভাইস ও নগদ টাকা উদ্ধার।
প্রেসিডেন্সি জেলে ‘হাই-সিকিউরিটি’ বন্দি আফতাবের সেলে আইফোন-রাউটার!

কলকাতা, ন্যাশনাল ডেস্ক : জেলের অন্দরে বন্দি কুখ্যাত জঙ্গির সেল থেকে একের পর এক ইলেকট্রনিক ডিভাইস উদ্ধারের ঘটনায় রীতিমতো চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে কলকাতায়। আমেরিকান সেন্টার হামলার অন্যতম মূল চক্রী এবং যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আফতাব আনসারির প্রেসিডেন্সি জেলের সেল থেকে উদ্ধার হয়েছে একাধিক মোবাইল ফোন, আইফোন, জিও রাউটার, সিমকার্ড, পেনড্রাইভ, ওটিজি ডিভাইস এবং নগদ টাকা। ঘটনায় প্রেসিডেন্সি জেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে উঠতে শুরু করেছে একাধিক গুরুতর প্রশ্ন।
জেল সূত্রে জানা গিয়েছে, আফতাব আনসারির সেল থেকে তিনটি স্মার্টফোনের পাশাপাশি একটি আইফোন উদ্ধার হয়েছে। এছাড়াও মিলেছে দু’টি জিও রাউটার, তিনটি জিও সিমকার্ড, একটি ওয়াইফাই হটস্পট, কার্ড রিডার, ১২৮ জিবির পেনড্রাইভ, একাধিক OTG ডিভাইস ও একটি হেডফোন। এর সঙ্গে উদ্ধার হয়েছে নগদ ৩১ হাজার টাকা। সম্প্রতি প্রেসিডেন্সি জেলে বিশেষ তল্লাশি অভিযান চালানোর সময় এই বিপুল পরিমাণ সামগ্রী উদ্ধার করা হয়।
ঘটনার পর থেকেই তদন্তকারীদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—জেলের ভিতরে বসে ঠিক কী করছিল আফতাব? কার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিল সে? এতগুলি যোগাযোগের সরঞ্জাম তার সেলে কীভাবে পৌঁছল? এবং এর পিছনে জেলের ভিতরের কোনও ব্যক্তি বা চক্রের ভূমিকা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বিশেষ করে রাউটার, একাধিক সিমকার্ড, স্মার্টফোন এবং পেনড্রাইভ উদ্ধারের ঘটনায় তদন্তকারীদের সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছে। আফতাব জেল থেকে কোনও সংগঠিত নেটওয়ার্কের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিল কি না, সে বিষয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। এমনকি পাকিস্তানের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগের কোনও চেষ্টা হয়েছিল কি না, সেই সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে সূত্রের খবর। তবে এই যোগাযোগের বিষয়ে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে চাইছেন না তদন্তকারীরা।
মৃত্যুদণ্ড থেকে যাবজ্জীবন—দীর্ঘ আইনি ইতিহাস আফতাবের
আফতাব আনসারির নাম জড়িয়ে রয়েছে কলকাতার আমেরিকান সেন্টারে জঙ্গি হামলার ঘটনায়। ওই মামলায় প্রথমে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে কলকাতা হাইকোর্ট সেই সাজা বহাল রাখে। পরে সুপ্রিম কোর্ট মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দেয়। এরপর থেকেই প্রেসিডেন্সি জেলে বন্দি রয়েছে আফতাব।
এমন একজন হাই-সিকিউরিটি বন্দির সেল থেকে এত বিপুল পরিমাণ ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম উদ্ধারের ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই জেল প্রশাসনের নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জেলের ভিতরে কে পৌঁছে দিল এত সরঞ্জাম?
তদন্তকারীদের কাছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—এই সমস্ত নিষিদ্ধ ইলেকট্রনিক সামগ্রী আফতাবের কাছে পৌঁছল কীভাবে?
জেলের মতো কড়া নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকায় একটি আইফোন, একাধিক স্মার্টফোন, রাউটার, সিমকার্ড এবং পেনড্রাইভ ঢোকানো সহজ নয়। ফলে জেলের ভিতরে কোনও অসাধু চক্র সক্রিয় ছিল কি না, সেই সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কারাকর্মীদের কেউ এই ঘটনায় জড়িত কি না, কিংবা বাইরের কোনও ব্যক্তির মাধ্যমে এসব সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল কি না—তাও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
এদিকে, উদ্ধার হওয়া ডিভাইসগুলি ফরেন্সিক পরীক্ষার মাধ্যমে খতিয়ে দেখা হতে পারে। সেগুলিতে কী ধরনের তথ্য রয়েছে, কোন নম্বরে যোগাযোগ করা হয়েছিল এবং কোনও সন্দেহজনক যোগাযোগ বা তথ্য আদানপ্রদানের প্রমাণ পাওয়া যায় কি না, সেদিকেও নজর রয়েছে তদন্তকারীদের।
প্রেসিডেন্সি জেলের নিরাপত্তা নিয়ে ফের বড় প্রশ্ন
প্রেসিডেন্সি জেল কলকাতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চ নিরাপত্তাবেষ্টিত সংশোধনাগার। সেখানে এমন একজন বন্দির সেল থেকে যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত হতে পারে এমন এতগুলি ডিভাইস উদ্ধারের ঘটনা নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।
ঘটনাটি সামনে আসার পর জেল কর্তৃপক্ষের তল্লাশি, নজরদারি এবং বন্দিদের সেলের নিয়মিত পরীক্ষা কতটা কার্যকর, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে এমন কোনও সরঞ্জাম সেলের ভিতরে ছিল কি না, নাকি সম্প্রতি সেগুলি পৌঁছেছে—তাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
আগেও জেল থেকে ‘নেটওয়ার্ক’ চালানোর অভিযোগ
আফতাব আনসারির বিরুদ্ধে এর আগেও জেল থেকে বাইরে যোগাযোগ রাখার অভিযোগ উঠেছিল। এবার তার সেল থেকে একসঙ্গে এতগুলি যোগাযোগের সরঞ্জাম উদ্ধারের ঘটনায় সেই পুরনো অভিযোগই ফের সামনে এসেছে। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, উদ্ধার হওয়া ডিভাইসগুলির মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে কোনও যোগাযোগ চলছিল কি না।
বর্তমানে সবচেয়ে বড় রহস্য হয়ে দাঁড়িয়েছে—আফতাব কার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিল এবং সেই যোগাযোগের উদ্দেশ্যই বা কী ছিল?
পুলিশ ও জেল প্রশাসনের তদন্তে এই প্রশ্নগুলির উত্তর মিললেই পরিষ্কার হবে, প্রেসিডেন্সি জেলের ভিতরে ঠিক কতটা সক্রিয় ছিল এই কথিত ‘যোগাযোগ নেটওয়ার্ক’। পাশাপাশি, জেলের মতো উচ্চ নিরাপত্তার জায়গায় এতগুলি নিষিদ্ধ সামগ্রী কীভাবে ঢুকল, সেই প্রশ্নের উত্তরও খুঁজছেন তদন্তকারীরা।
