বিহারে বিদ্যুৎ বিপ্লব! ৫ বছরে ₹১.৩৮ লক্ষ কোটি বিনিয়োগ, ২০৩০-এ ২৪ GW গ্রিন এনার্জির লক্ষ্য
বিহারের বিদ্যুৎ ও সৌরশক্তি খাতে আগামী পাঁচ বছরে ₹১.৩৮ লক্ষ কোটি বিনিয়োগের ঘোষণা। ২০৩০ সালের মধ্যে ২৪ গিগাওয়াট পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি উৎপাদনের লক্ষ্য রাজ্য সরকারের।
বিহারে বিদ্যুৎ বিপ্লবের বড় ঘোষণা! ৫ বছরে ₹১.৩৮ লক্ষ কোটি বিনিয়োগ, ২০৩০-এর মধ্যে ২৪ গিগাওয়াট গ্রিন এনার্জির লক্ষ্য
পাটনা, ন্যাশনাল ডেস্ক ৮ : বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো, বাইরের রাজ্য থেকে বিদ্যুৎ কেনার উপর নির্ভরতা কমানো এবং পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির ক্ষেত্রে বড়সড় পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে নজিরবিহীন বিনিয়োগ পরিকল্পনা ঘোষণা করল বিহার সরকার। আগামী পাঁচ বছরে রাজ্যের বিদ্যুৎ ও সৌরশক্তি পরিকাঠামো উন্নয়নে মোট ১ লক্ষ ৩৮ হাজার ৫৪১ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

এই মেগা বিনিয়োগের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সৌরশক্তি, এনার্জি স্টোরেজ, গ্রিন এনার্জি করিডোর এবং রুফটপ সোলারের মতো একাধিক ক্ষেত্রে বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়েছে রাজ্য সরকার।
‘ভারত ইলেকট্রিসিটি-২০২৬’ সম্মেলনে বড় ঘোষণা
‘ভারত ইলেকট্রিসিটি-২০২৬’ সম্মেলনে বিহারের বিদ্যুৎমন্ত্রী শৈলেশ কুমার (বুলো মন্ডল) রাজ্যের এই বৃহৎ বিনিয়োগ পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিহারের বিদ্যুৎ, সৌরশক্তি এবং সংশ্লিষ্ট পরিকাঠামো ক্ষেত্রে বিনিয়োগের আহ্বান জানানো হয়েছে।
সরকারের লক্ষ্য, আগামী কয়েক বছরে রাজ্যের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সঞ্চালন ব্যবস্থাকে আধুনিক করে ভবিষ্যতের বাড়তে থাকা বিদ্যুতের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলা।
২০৩০ সালের মধ্যে ২৪ গিগাওয়াট পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির লক্ষ্য
বিহারের রিনিউএবল এনার্জি পলিসি ২০২৫ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে রাজ্যে ২৪ গিগাওয়াট পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে।
শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, উৎপাদিত গ্রিন এনার্জি সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও বড় পরিকল্পনা রয়েছে। রাজ্যে প্রায় ৬ গিগাওয়াট-আওয়ার (GWh) এনার্জি স্টোরেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সৌরবিদ্যুতের মতো উৎস থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সংরক্ষণ করতে পারলে দিনের বিভিন্ন সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা সহজ হবে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে বরাদ্দ ৮২ হাজার কোটি টাকার বেশি
পাঁচ বছরের এই মেগা বিনিয়োগ পরিকল্পনার মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য প্রায় ৮২ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
এই অর্থ ব্যবহার করে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র, পাম্পড-স্টোরেজ পাওয়ার প্রকল্প এবং অন্যান্য বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিকাঠামো গড়ে তোলা হবে।
রাজ্যের নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতে ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা মেটানোই এই বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
৬৮০ সার্কিট কিলোমিটার গ্রিন এনার্জি করিডোর
বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি উৎপাদিত সৌরবিদ্যুৎ দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও বড় পদক্ষেপ নিচ্ছে বিহার সরকার।
প্রায় ২৪ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি করা হবে প্রায় ৬৮০ সার্কিট কিলোমিটার দীর্ঘ গ্রিন এনার্জি করিডোর।
এই করিডোরের মাধ্যমে নতুন সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলিকে মূল বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা সহজ হবে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত ও গ্রামীণ অঞ্চলে পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি প্রকল্প সম্প্রসারণে এই পরিকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
কাজরা সোলার পাওয়ার প্ল্যান্টে ₹২,৮৬৬ কোটি বিনিয়োগ
বিহারের বৃহৎ সৌরশক্তি পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হল লাকিসরাই জেলার কাজরা সোলার পাওয়ার প্ল্যান্ট।
প্রায় ২,৮৬৬ কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলা হবে এই প্রকল্প। এখানে থাকবে—
- ৩০১ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা
- ৫২৩ মেগাওয়াট-আওয়ার ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম (BESS)
এর ফলে দিনের বেলা উৎপাদিত অতিরিক্ত সৌরবিদ্যুৎ ব্যাটারিতে সংরক্ষণ করা যাবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তী সময়ে সেই বিদ্যুৎ ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
পাশাপাশি ঔরঙ্গাবাদে ১৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি সোলার পার্ক তৈরির কাজও শুরু হয়েছে। আগামী দিনে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় আরও একাধিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
বাড়ির ছাদে সোলার বসালেও মিলবে অতিরিক্ত সুবিধা
শুধু বড় শিল্প ও বিদ্যুৎ প্রকল্পেই নয়, সাধারণ মানুষের বাড়িতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও উৎসাহ বাড়াতে চাইছে বিহার সরকার।
কেন্দ্রের ‘প্রধানমন্ত্রী সূর্য ঘর: মুফত বিজলি যোজনা’-র পাশাপাশি রাজ্য সরকার আবাসিক গ্রাহকদের জন্য অতিরিক্ত ভর্তুকি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী—
- প্রতি কিলোওয়াটের জন্য ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত রাজ্য ভর্তুকি
- সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত সুবিধা
এর ফলে বাড়ির ছাদে সৌর প্যানেল বসানোর খরচ কমার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুতের বিলেও সাশ্রয় হতে পারে।
২.৫ লক্ষ দরিদ্র পরিবার পাবে বিনামূল্যে রুফটপ সোলার
রাজ্যের দরিদ্র ও BPL পরিবারগুলিকেও এই গ্রিন এনার্জি পরিকল্পনার আওতায় আনা হচ্ছে।
বিহার সরকার প্রায় ২.৫ লক্ষ দরিদ্র পরিবারকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ১.১ কিলোওয়াট ক্ষমতার রুফটপ সোলার সিস্টেম দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে।
সরকারের আশা, এর ফলে একদিকে যেমন পরিবারের বিদ্যুৎ খরচ কমবে, তেমনই অন্যদিকে রাজ্যে বিকেন্দ্রীভূত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণও বাড়বে।
বাইরের বিদ্যুৎ কেনার খরচ কমানোই বড় লক্ষ্য
বর্তমানে চাহিদা মেটাতে বিহারকে বাইরের উৎস থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ কিনতে হয়। এর ফলে রাজ্যের বিদ্যুৎ ক্রয় খরচ এবং আর্থিক চাপ বাড়ে।
নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনার মাধ্যমে রাজ্যের নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়ে বাইরের উপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
সৌরবিদ্যুৎ, এনার্জি স্টোরেজ এবং আধুনিক বিদ্যুৎ সঞ্চালন পরিকাঠামোর সমন্বয়ে আগামী দিনে বিহারের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী, নির্ভরযোগ্য ও স্বনির্ভর হয়ে উঠবে বলেই আশা করছে রাজ্য সরকার।
সব মিলিয়ে, আগামী পাঁচ বছরে ১ লক্ষ ৩৮ হাজার ৫৪১ কোটি টাকার বিনিয়োগ পরিকল্পনা বিহারের বিদ্যুৎ ও পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ২৪ গিগাওয়াট গ্রিন এনার্জি উৎপাদনের লক্ষ্য পূরণ করতে পারলে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির বাজার হিসেবে বিহারের গুরুত্ব অনেকটাই বাড়তে পারে।
