হিমালয়ে বাড়ছে GLOF ও তুষারধসের বিপদ! পাহাড়ি রাজ্যগুলিকে সতর্ক করল কেন্দ্র
জলবায়ু পরিবর্তন ও হিমবাহ গলনের জেরে হিমালয়ে GLOF ও তুষারধসের ঝুঁকি বাড়ছে। ঝুঁকিপূর্ণ রাজ্যগুলিকে আর্লি ওয়ার্নিং, ড্রোন নজরদারি ও মক ড্রিল জোরদারের নির্দেশ কেন্দ্রের
হিমালয়ে বাড়ছে হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণ ও তুষারধসের আশঙ্কা! পাহাড়ি রাজ্যগুলিকে আগাম প্রস্তুতির নির্দেশ কেন্দ্রের
নয়াদিল্লি, ন্যাশনাল ডেস্ক ৯ : জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হিমালয় অঞ্চলে দ্রুত বদলে যাচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবেশ। হিমবাহ গলনের ফলে বাড়ছে হিমবাহ হ্রদের জলস্তর, তৈরি হচ্ছে আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা। সেই সঙ্গে উচ্চ পার্বত্য এলাকায় তুষারধসের ঝুঁকিও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে প্রশাসনের।
এই পরিস্থিতিতে হিমালয় সংলগ্ন রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলিকে হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা বা GLOF (Glacial Lake Outburst Flood) এবং তুষারধস (Avalanche) মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক।

ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহ হ্রদ চিহ্নিত করা থেকে শুরু করে আধুনিক আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, উপগ্রহ ও ড্রোনে নজরদারি, স্থানীয় মানুষকে প্রশিক্ষণ এবং উদ্ধারকারী দলকে প্রস্তুত রাখা—সব ক্ষেত্রেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
হিমবাহ গলনে বাড়ছে বিপদের আশঙ্কা
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয়ের বিভিন্ন অঞ্চলে হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর ফলে একাধিক হিমবাহ হ্রদে জলস্তর বৃদ্ধি পেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, কোনও হিমবাহ হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ বা বরফ ও পাথরের তৈরি প্রতিবন্ধক ভেঙে গেলে আচমকা বিপুল পরিমাণ জল নিচের দিকে নেমে আসতে পারে। এর জেরে মুহূর্তের মধ্যে তৈরি হতে পারে বিধ্বংসী আকস্মিক বন্যা।
এই ধরনের বিপর্যয়ে পাহাড়ি জনবসতি, রাস্তা, সেতু, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, বিদ্যুৎ পরিকাঠামো এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে।
তাই দুর্যোগ ঘটার পরে শুধুমাত্র উদ্ধারকাজে জোর দেওয়ার বদলে, আগেভাগেই ঝুঁকি চিহ্নিত করে ক্ষয়ক্ষতি কমানোর উপর গুরুত্ব দিয়েছে কেন্দ্র।
ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহ হ্রদের তালিকা তৈরির নির্দেশ
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নির্দেশ অনুযায়ী, পাহাড়ি অঞ্চলে থাকা সম্ভাব্য বিপজ্জনক হিমবাহ হ্রদগুলিকে চিহ্নিত করে নিয়মিত পর্যবেক্ষণের আওতায় আনতে হবে।
বিশেষ নজর রাখতে হবে—
- কোন হ্রদের জলস্তর দ্রুত বাড়ছে
- কোথায় হিমবাহ গলনের হার বেশি
- কোন হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ দুর্বল হয়ে পড়ছে
- কোন এলাকায় হঠাৎ জলস্রোত নেমে আসার ঝুঁকি রয়েছে
এই তথ্যের ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলির জন্য পৃথক দুর্যোগ মোকাবিলা পরিকল্পনা তৈরির উপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
শক্তিশালী করা হবে আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম
GLOF বা তুষারধসের মতো দুর্যোগ খুব অল্প সময়ের মধ্যে ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। তাই বিপদের আগাম সংকেত পাওয়া এবং দ্রুত সাধারণ মানুষকে সতর্ক করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই কারণে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলিতে আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম আরও শক্তিশালী করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সেন্সর, স্বয়ংক্রিয় পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে হ্রদের জলস্তর, বরফের অবস্থা এবং ভূমির পরিবর্তন পর্যবেক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে।
কোনও অস্বাভাবিক পরিবর্তন ধরা পড়লে দ্রুত স্থানীয় প্রশাসন, উদ্ধারকারী দল এবং সাধারণ মানুষের কাছে সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও জোরদার করার কথা বলা হয়েছে।
উপগ্রহ ও ড্রোনে নজরদারি বাড়ানোর পরিকল্পনা
হিমালয়ের বহু দুর্গম অঞ্চলে সরাসরি পৌঁছে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত কঠিন। তাই প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
উপগ্রহ চিত্রের মাধ্যমে হিমবাহ হ্রদের আয়তন, জলস্তরের পরিবর্তন এবং বরফের অবস্থার পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ড্রোন প্রযুক্তির সাহায্যে দুর্গম পাহাড়ি এলাকার কাছ থেকে ছবি ও তথ্য সংগ্রহের পরিকল্পনাও রয়েছে।
জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বা NDMA, বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট রাজ্য প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে এই নজরদারি আরও কার্যকর করার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশিক্ষণে বিশেষ গুরুত্ব
প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশাসনিক প্রস্তুতির পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পাহাড়ি অঞ্চলের বাসিন্দাদের GLOF, তুষারধস এবং আকস্মিক বন্যার সম্ভাব্য লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জানানো হবে—
- কখন দ্রুত এলাকা ছেড়ে নিরাপদ স্থানে যেতে হবে
- প্রশাসনের সতর্কবার্তা পেলে কী করতে হবে
- কোন পথে নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পৌঁছতে হবে
- জরুরি পরিস্থিতিতে কীভাবে উদ্ধারকারী দলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে
একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলিতে আগে থেকেই নিরাপদ আশ্রয়স্থল এবং ইভাকুয়েশন রুট নির্দিষ্ট করে রাখার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
SDRF ও উদ্ধারকারী দলকে প্রস্তুত রাখার নির্দেশ
উচ্চ পার্বত্য এলাকায় উদ্ধার অভিযান অত্যন্ত কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ। তুষারপাত, ভূমিধস, রাস্তা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার কারণে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হতে পারে।
এই কারণে SDRF এবং স্থানীয় উদ্ধারকারী দলগুলিকে সর্বদা প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রয়োজনীয় উদ্ধার সরঞ্জাম, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং প্রশিক্ষিত কর্মী আগে থেকেই প্রস্তুত রাখার উপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যাতে দুর্যোগের পরে দ্রুত উদ্ধার অভিযান শুরু করা যায়।
নিয়মিত মক ড্রিলের উপর জোর
সম্ভাব্য দুর্যোগের সময় প্রশাসনের প্রস্তুতি কতটা কার্যকর, তা যাচাই করতে নিয়মিত মক ড্রিল বা দুর্যোগ মহড়া করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই মহড়ায় প্রশাসন, পুলিশ, SDRF, স্থানীয় উদ্ধারকারী দল এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সমন্বয় পরীক্ষা করা হবে।
এর মাধ্যমে সম্ভাব্য দুর্বলতা বা প্রস্তুতির ঘাটতি আগেভাগেই চিহ্নিত করে তা সংশোধন করা সম্ভব হবে।
কোন কোন হিমালয় অঞ্চলে বিশেষ নজর?
কেন্দ্রের এই সতর্কতামূলক প্রস্তুতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিমালয় সংলগ্ন রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির জন্য। এর মধ্যে রয়েছে—
- জম্মু ও কাশ্মীর
- লাদাখ
- হিমাচল প্রদেশ
- উত্তরাখণ্ড
- সিকিম
- অরুণাচল প্রদেশ
এই অঞ্চলগুলিতে বিপুল সংখ্যক হিমবাহ, তুষারাবৃত পর্বত এবং উচ্চ পার্বত্য হ্রদ রয়েছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তন, দ্রুত হিমবাহ গলন এবং চরম আবহাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হলে আকস্মিক বন্যা ও তুষারধসের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উদ্বেগ বাড়ছে
হিমালয় অঞ্চলকে জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম সংবেদনশীল অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাপমাত্রার পরিবর্তন এবং হিমবাহের গলনের ফলে দীর্ঘমেয়াদে হিমবাহ হ্রদের সংখ্যা, আকার ও জলধারণ ক্ষমতায় পরিবর্তন ঘটতে পারে।
এর সঙ্গে অতিবৃষ্টি, আকস্মিক আবহাওয়া পরিবর্তন বা অন্যান্য প্রাকৃতিক কারণ যুক্ত হলে বিপর্যয়ের আশঙ্কা আরও বাড়তে পারে।
এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রের মূল লক্ষ্য হল দুর্যোগ ঘটার পরে শুধুমাত্র উদ্ধার অভিযানে সীমাবদ্ধ না থেকে আগেভাগেই ঝুঁকি চিহ্নিত করা এবং সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমানো।
প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, শক্তিশালী আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, প্রশাসনিক প্রস্তুতি এবং স্থানীয় মানুষের সচেতনতা—এই চারটি বিষয়কে সামনে রেখেই হিমালয় অঞ্চলে দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি আরও জোরদার করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, দ্রুত পরিবর্তনশীল হিমালয় পরিবেশ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রের এই নির্দেশকে আগাম দুর্যোগ মোকাবিলায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
