দুর্গাপুজোর আগে কলকাতায় ৪০ রেস্তোরাঁর লাইসেন্স সাসপেন্ড, উদ্ধার ১,২২৪ কেজি অস্বাস্থ্যকর খাবার
দুর্গাপুজোর আগে কলকাতায় ৫৯২টি খাদ্যপ্রতিষ্ঠানে অভিযান। স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে প্রায় ৪০টি রেস্তোরাঁ ও খাদ্যবিপণির লাইসেন্স দুই সপ্তাহের জন্য সাসপেন্ড।
দুর্গাপুজোর আগে কলকাতায় প্রায় ৪০টি নামী রেস্তোরাঁ ও খাদ্যবিপণির লাইসেন্স সাসপেন্ড

কলকাতা, স্টেট ডেস্ক ৮ : দুর্গাপুজোর মরশুম শুরুর আগেই শহরের রেস্তোরাঁ, মিষ্টির দোকান এবং বিভিন্ন খাদ্যবিপণিতে স্বাস্থ্যবিধি ও খাদ্যসুরক্ষা নিশ্চিত করতে বড়সড় অভিযান চালাল কলকাতা পুরসভা। অভিযানে একাধিক প্রতিষ্ঠানের রান্নাঘর ও খাদ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থায় গুরুতর অনিয়ম ধরা পড়েছে বলে পুরসভা সূত্রে খবর। অভিযোগের ভিত্তিতে শহরের প্রায় ৪০টি নামী রেস্তোরাঁ ও খাদ্যবিপণির লাইসেন্স সাময়িকভাবে দুই সপ্তাহের জন্য সাসপেন্ড করা হয়েছে।
দুর্গাপুজোর আগে শহরে খাবারের চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে পুজোর দিনগুলিতে বিভিন্ন রেস্তোরাঁ, মিষ্টির দোকান ও খাদ্যবিপণিতে ক্রেতাদের ভিড় থাকে চোখে পড়ার মতো। সেই সময় যাতে অস্বাস্থ্যকর বা নিম্নমানের খাবার সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে না যায়, তা নিশ্চিত করতেই কলকাতা পুরসভার তরফে বিশেষ নজরদারি অভিযান চালানো হয়।
এক সপ্তাহে ৫৯২টি প্রতিষ্ঠানে তল্লাশি
পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, ১ সেপ্টেম্বর থেকে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ‘বিশেষ খাদ্য সুরক্ষা সপ্তাহ’ পালন করা হয়। এই সময় কলকাতা শহরের বিভিন্ন প্রান্তে মোট ৫৯২টি খাদ্য প্রস্তুতকারী ও বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালানো হয়।
রেস্তোরাঁর রান্নাঘর, খাবার তৈরির জায়গা, খাদ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা, ফ্রিজ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অংশ সরেজমিনে পরিদর্শন করেন পুরসভার আধিকারিকরা। কোথাও খাবারের মান, কোথাও আবার রান্নাঘরের পরিচ্ছন্নতা এবং খাদ্য সংরক্ষণের নিয়ম মানা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হয়।
অভিযানে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে গুরুতর স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ সামনে এসেছে বলে জানা গিয়েছে।
রান্নাঘরে ইঁদুর-আরশোলা, ফ্রিজে পচা মাংস!
পুরসভার অভিযানে যে ছবিগুলি সামনে এসেছে, তা যথেষ্ট উদ্বেগজনক। একাধিক প্রতিষ্ঠানের রান্নাঘরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, নোংরা ও অপরিচ্ছন্ন জায়গায় খাবার প্রস্তুতের অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে। কোথাও আবার ইঁদুর ও আরশোলার উপদ্রবেরও প্রমাণ মিলেছে।
শুধু তাই নয়, কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ফ্রিজে ছত্রাকযুক্ত এবং পচা মাংস পাওয়া গিয়েছে বলে পুরসভা সূত্রে দাবি। খাবার দীর্ঘ সময় ধরে যথাযথ তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা হচ্ছে কি না, সেই বিষয়েও একাধিক ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠেছে।
খাবারে অননুমোদিত রঙ ব্যবহারের অভিযোগও সামনে এসেছে। এমনকি কোথাও কোথাও খাবারে ক্ষতিকর বা অননুমোদিত রঙ এবং দেওয়ালের রং জাতীয় উপাদান ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে বলে পুরসভার তরফে জানানো হয়েছে। এই ধরনের উপাদান খাবারের সঙ্গে মিশলে তা সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
নষ্ট করা হয়েছে ১,২২৪ কেজি অস্বাস্থ্যকর খাবার
অভিযানের সময় বিপুল পরিমাণ বাসি, পচা ও অস্বাস্থ্যকর খাবার উদ্ধার করে তা নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। পুরসভা সূত্রের খবর, পুরো অভিযানে প্রায় ১,২২৪ কেজি খাবার নষ্ট করা হয়েছে।
পুরসভার আধিকারিকদের বক্তব্য, উৎসবের মরশুমে খাবারের চাহিদা বাড়ার সুযোগ নিয়ে যাতে কোনও প্রতিষ্ঠান নিম্নমানের বা দীর্ঘদিন সংরক্ষিত খাবার বিক্রি করতে না পারে, সে বিষয়েই বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে।
তালিকায় একাধিক পরিচিত নাম
লাইসেন্স সাসপেন্ড হওয়া প্রতিষ্ঠানের তালিকায় কলকাতার একাধিক পরিচিত নাম রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। পুরসভার প্রশাসক স্মিতা পাণ্ডে জানিয়েছেন, ওই তালিকায় রয়েছে ডন জিওভানি’স, করিম’স, বলরাম মল্লিক ও রাধারমণ মল্লিক, মিষ্টিমুখ, আরসালান, শিমলা ফুড-সহ বেশ কয়েকটি নামী রেস্তোরাঁ ও খাদ্যবিপণি।
এছাড়াও কলকাতার দীর্ঘদিনের পরিচিত ও ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান নিজাম’স-এর নামও এই তালিকায় রয়েছে বলে পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে।
নামী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও যদি খাদ্যসুরক্ষা বিধি বা স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে কোনওরকম ছাড় দেওয়া হবে না—পুরসভার এই অভিযানের মাধ্যমে সেই বার্তাই স্পষ্ট হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
কেন সরাসরি লাইসেন্স বাতিল নয়?
পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলির ক্ষেত্রে আপাতত সরাসরি লাইসেন্স বাতিলের পরিবর্তে দুই সপ্তাহের জন্য লাইসেন্স সাসপেন্ড করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠানগুলিকে নিজেদের রান্নাঘর, খাদ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরিকাঠামো সংশোধন করার সুযোগ দেওয়া হবে।
অভিযানে অনিয়ম ধরা পড়া প্রতিষ্ঠানগুলি প্রয়োজনীয় সংশোধন করার পর ফের আবেদন করতে পারবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে সন্তুষ্ট হলে লাইসেন্স পুনরায় চালুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
পুজোর আগে আরও কড়া নজরদারির ইঙ্গিত
দুর্গাপুজো যত এগিয়ে আসছে, কলকাতায় রেস্তোরাঁ ও খাদ্যবিপণিগুলিতে ভিড়ও তত বাড়বে। ফলে পুজোর আগে খাদ্যের গুণমান এবং স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে পুরসভার নজরদারি আরও বাড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশেষ করে রান্নাঘরের পরিচ্ছন্নতা, খাবারের মেয়াদ, কাঁচামাল সংরক্ষণ, ফ্রিজের ব্যবহার, পচা বা বাসি খাবার মজুত করা এবং খাবারে অননুমোদিত রাসায়নিক বা রঙ ব্যবহারের মতো বিষয়গুলিতে এবার আরও কড়া নজরদারি চালানো হবে বলে পুরসভা সূত্রে ইঙ্গিত মিলেছে।
দুর্গাপুজোর উৎসবের মরশুমে কলকাতার মানুষ যাতে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার পান, সেই লক্ষ্যেই পুরসভার এই বিশেষ অভিযান বলে মনে করা হচ্ছে।
