শিক্ষক দিবসে মোদীর বড় বার্তা, পড়ুয়াদের স্ক্রিনটাইম ও মাদকাসক্তি রুখতে শিক্ষকদের ভূমিকা
শিক্ষক দিবসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিশেষ বার্তা। অতিরিক্ত স্ক্রিনটাইম, ডিজিটাল আসক্তি ও মাদকাসক্তি থেকে পড়ুয়াদের দূরে রাখতে শিক্ষকদের সক্রিয় ভূমিকার আহ্বান।
শিক্ষক দিবসে মোদীর বড় বার্তা, ‘স্ক্রিনটাইম ও মাদকাসক্তি থেকে দূরে রাখতে ভূমিকা নিতে হবে শিক্ষকদের’

নয়াদিল্লি, ৫ সেপ্টেম্বর, ন্যাশনাল ডেস্ক ১১: শিক্ষক দিবস উপলক্ষে দেশের শিক্ষক সমাজকে বিশেষ বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। শনিবার শিক্ষক দিবসের অনুষ্ঠানে দেশের ৮২ জন জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত শিক্ষকের সঙ্গে বিশেষ আলোচনায় অংশ নিয়ে বর্তমান প্রজন্মের পড়ুয়াদের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের মধ্যে অতিরিক্ত স্ক্রিনটাইম, ডিজিটাল ডিভাইসের প্রতি আসক্তি এবং মাদকাসক্তির প্রবণতা নিয়ে সতর্ক করেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, শিক্ষকের দায়িত্ব শুধুমাত্র শ্রেণিকক্ষে পড়ানো, সিলেবাস শেষ করা কিংবা পরীক্ষায় ভালো ফল করানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পড়ুয়াদের মানসিক বিকাশ, সামাজিক আচরণ এবং দৈনন্দিন জীবনে কোনও অস্বাভাবিক পরিবর্তন হচ্ছে কি না, সে দিকেও শিক্ষকদের নজর দেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
‘স্ক্রিনটাইম এখন এক ধরনের আসক্তি’
বর্তমান সময়ে শিশুদের হাতে খুব সহজেই পৌঁছে যাচ্ছে স্মার্টফোন, ট্যাব, কম্পিউটার ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস। ভিডিও গেম, সোশ্যাল মিডিয়া এবং বিভিন্ন অনলাইন বিনোদনের কারণে অনেক পড়ুয়ার দৈনিক জীবনের বড় অংশ স্ক্রিনের সামনে কেটে যাচ্ছে। এই প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “স্ক্রিনটাইম এখন এক ধরনের নেশা বা আসক্তিতে পরিণত হয়েছে।”
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় পড়ুয়াদের বিকল্প ব্যস্ততার দিকে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। ভিডিও গেম বা দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহারের পরিবর্তে শিশুদের মাঠের খেলাধুলা, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং বিভিন্ন সৃজনশীল কাজে উৎসাহিত করার জন্য শিক্ষকদের উদ্যোগী হতে বলেন।
প্রধানমন্ত্রীর মতে, পড়ুয়াদের হাতে মোবাইল তুলে নেওয়া আটকানোর পাশাপাশি তাঁদের এমন কিছু কাজে যুক্ত করতে হবে, যাতে তাঁরা স্বাভাবিকভাবেই ডিজিটাল ডিভাইসের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে পারেন।
অভিভাবকদের সঙ্গেও কথা বলার পরামর্শ
শুধু স্কুলে নজর রাখলেই এই সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী। অনেক শিশু রাত পর্যন্ত মোবাইল ব্যবহার করে বা পড়াশোনার সময়ও ফোন ও অন্যান্য ডিভাইসে ব্যস্ত থাকে। তাই শিক্ষকদের প্রয়োজনে অভিভাবকদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
শিক্ষকদের উদ্দেশে তাঁর বার্তা, কোনও পড়ুয়ার স্ক্রিন ব্যবহারের সময় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে কিংবা তার আচরণে পরিবর্তন দেখা দিলে বিষয়টি উপেক্ষা না করে পরিবারকে অবহিত করতে হবে। শিক্ষক ও অভিভাবকদের যৌথ উদ্যোগেই শিশুদের ডিজিটাল আসক্তি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে।
মাদকাসক্তি নিয়েও গভীর উদ্বেগ
শিক্ষক দিবসের আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী মাদকাসক্তির বিষয়টিও বিশেষভাবে তুলে ধরেন। বড় শহর, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাদকের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর মতে, অনেক ক্ষেত্রেই কোনও পড়ুয়া কীভাবে বা কার মাধ্যমে মাদকের সংস্পর্শে আসছে, তা প্রথম পর্যায়ে সহজে বোঝা যায় না। ফলে সমস্যাটি চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে শিক্ষকদের সতর্ক থাকা অত্যন্ত জরুরি।
তিনি শিক্ষকদের বলেন, কোনও পড়ুয়ার আচরণ, ব্যবহার, মনোভাব কিংবা দৈনন্দিন অভ্যাসে হঠাৎ কোনও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে কি না, তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। পরিবর্তনের কারণ বোঝার চেষ্টা করতে হবে এবং প্রয়োজন হলে অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনা করে উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে।
শুধু পরীক্ষার ফল নয়, পড়ুয়ার জীবনও গুরুত্বপূর্ণ
প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে দেন, শিক্ষকের দায়িত্ব শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ানো নয়। একটি শিশুর সার্বিক বিকাশের ক্ষেত্রেও শিক্ষকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
বিশেষ করে বর্তমান সময়ে বহু পরিবার একক পরিবারে পরিণত হওয়ায় শিশুদের দৈনন্দিন জীবনে অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগের সময় অনেক ক্ষেত্রে কমে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে স্কুল ও শিক্ষকদের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে প্রধানমন্ত্রী মনে করেন।
তাঁর মতে, একজন শিক্ষককে বুঝতে হবে কোনও পড়ুয়া স্বাভাবিকভাবে আচরণ করছে কি না, তার মধ্যে হঠাৎ কোনও পরিবর্তন এসেছে কি না, সে আগের মতো বন্ধুদের সঙ্গে মিশছে কি না কিংবা পড়াশোনার প্রতি তার আগ্রহ কমে যাচ্ছে কি না।
পড়ুয়ার ‘শৈশব’ বাঁচিয়ে রাখার বার্তা
শিক্ষক দিবসে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের অন্যতম আবেগঘন অংশ ছিল শিশুদের স্বাভাবিক কৌতূহল ও শৈশবকে বাঁচিয়ে রাখার আহ্বান।
তিনি শিক্ষকদের উদ্দেশে বলেন, শিশুদের মধ্যে থাকা স্বাভাবিক কৌতূহলকে কোনওভাবেই নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না। প্রযুক্তি, পড়াশোনার চাপ কিংবা প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়ে যেন শিশুদের স্বাভাবিক আনন্দ, অনুসন্ধিৎসা ও সৃজনশীলতা হারিয়ে না যায়, সেদিকে নজর রাখতে হবে।
শিক্ষকদের সবচেয়ে বড় অবদান হতে পারে—পড়ুয়াদের মনের মধ্যে থাকা সেই স্বাভাবিক ‘শৈশব’কে জীবন্ত রাখা। কারণ শিক্ষা শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়; একজন শিশুর চিন্তাভাবনা, মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা ও ব্যক্তিত্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও শিক্ষকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৮২ জন জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত শিক্ষকের সঙ্গে বিশেষ আলোচনা
শিক্ষক দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী দেশের ৮২ জন জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত শিক্ষকের সঙ্গে বিশেষ আলোচনায় অংশ নেন। এই আলোচনায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষা ব্যবস্থা, পড়ুয়াদের বর্তমান সমস্যা এবং শিক্ষকদের ভূমিকা নিয়ে মতবিনিময় হয়।
শিক্ষকদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তাঁদের অভিজ্ঞতা ও উদ্যোগের কথাও শোনেন। একইসঙ্গে নতুন প্রজন্মকে আরও দায়িত্বশীল, সৃজনশীল এবং প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারকারী হিসেবে গড়ে তুলতে শিক্ষকদের ভূমিকার উপর জোর দেন।
সব মিলিয়ে, শিক্ষক দিবসে প্রধানমন্ত্রীর বার্তার মূল সুর ছিল—শিক্ষকের দায়িত্ব শুধু শ্রেণিকক্ষের চার দেওয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পড়ুয়াদের মোবাইল ও প্রযুক্তি-নির্ভরতা, মাদকাসক্তির সম্ভাবনা, আচরণগত পরিবর্তন এবং মানসিক বিকাশ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই শিক্ষকদের আরও সক্রিয় ও সংবেদনশীল ভূমিকা নিতে হবে। একইসঙ্গে শিশুদের স্বাভাবিক কৌতূহল ও শৈশবকে সুরক্ষিত রাখার দায়িত্বও শিক্ষকদের কাঁধে রয়েছে বলে বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
