আফ্রিকার প্রকৃত আয়তন দেখাতে ‘কারেক্ট দ্য ম্যাপ’ প্রস্তাব রাষ্ট্রসংঘে পাস
আফ্রিকার প্রকৃত আয়তন ও ভৌগোলিক গুরুত্ব তুলে ধরতে রাষ্ট্রসংঘে পাস ‘কারেক্ট দ্য ম্যাপ’ প্রস্তাব। পক্ষে ১৬৪ দেশ, বিপক্ষে শুধু আমেরিকা।
আফ্রিকাকে ছোট করে দেখানো আর নয়! ‘কারেক্ট দ্য ম্যাপ’ প্রস্তাব পাস রাষ্ট্রসংঘে, পক্ষে ১৬৪ দেশ

নিউইয়র্ক, ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক ১০ : বিশ্বের প্রচলিত মানচিত্রে আফ্রিকা মহাদেশের প্রকৃত আয়তন ও ভৌগোলিক গুরুত্ব অনেকটাই খাটো করে দেখানো হয়—এমন দীর্ঘদিনের অভিযোগের প্রেক্ষিতে এবার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিল রাষ্ট্রসংঘ। আফ্রিকার প্রকৃত আকার ও অনুপাতকে আরও সঠিকভাবে বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে পাস হয়েছে ‘কারেক্ট দ্য ম্যাপ’ (Correct the Map) শীর্ষক একটি প্রস্তাব।
প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দিয়েছে ১৬৪টি দেশ। বিপক্ষে ভোট দিয়েছে একমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আরও ৬টি দেশ ভোটদানে বিরত থেকেছে। যদিও এই প্রস্তাব আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়, তবুও বিশ্বজুড়ে মানচিত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে এর যথেষ্ট প্রতীকী ও শিক্ষামূলক গুরুত্ব রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
বদলাতে পারে বহুল ব্যবহৃত মারকেটর মানচিত্র
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ভূগোল শেখানো ও বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে মারকেটর প্রজেকশন। প্রায় ৫০০ বছর আগে তৈরি এই মানচিত্রের অন্যতম সমস্যা হল—পৃথিবীর গোলাকার পৃষ্ঠকে সমতল কাগজে তুলে ধরার সময় বিভিন্ন অঞ্চলের প্রকৃত আয়তনের অনুপাত বদলে যায়।
বিশেষ করে বিষুবরেখা থেকে দূরে থাকা অঞ্চলগুলিকে তুলনামূলকভাবে অনেক বড় দেখায়। এর ফলে আফ্রিকার প্রকৃত আয়তনের সঙ্গে মানচিত্রে তার দৃশ্যমান আকারের বড় ধরনের পার্থক্য তৈরি হয়।
নতুন প্রস্তাবে তাই ‘ইকুয়াল আর্থ’ (Equal Earth)-এর মতো সমানুপাতিক মানচিত্র ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। এই ধরনের মানচিত্রে বিভিন্ন মহাদেশের আয়তনের তুলনামূলক চিত্র বাস্তবের কাছাকাছি থাকে।
গ্রিনল্যান্ডের মতো নয়, আফ্রিকা প্রায় ১৪ গুণ বড়
প্রচলিত মারকেটর মানচিত্রের সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণগুলির একটি হল আফ্রিকা ও গ্রিনল্যান্ড। মানচিত্রে দুই ভূখণ্ডকে প্রায় কাছাকাছি আয়তনের বলে মনে হলেও বাস্তবে তাঁদের মধ্যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে।
আফ্রিকার আয়তন প্রায় ৩ কোটি ৩৭ লক্ষ বর্গকিলোমিটার, যেখানে গ্রিনল্যান্ডের আয়তন প্রায় ২১ লক্ষ ৬৬ হাজার বর্গকিলোমিটার। অর্থাৎ আয়তনের বিচারে আফ্রিকা গ্রিনল্যান্ডের প্রায় ১৪ গুণ বড়।
মারকেটর প্রজেকশনের কারণে উত্তর মেরুর কাছাকাছি অবস্থিত গ্রিনল্যান্ডকে বাস্তবের তুলনায় অনেক বড় দেখায়। অন্যদিকে বিষুবরেখার কাছাকাছি থাকা আফ্রিকা তুলনামূলকভাবে ছোট বলে মনে হয়। ফলে বিশ্বের মানচিত্র দেখার সময় আফ্রিকার প্রকৃত বিস্তৃতি সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
শুধু আফ্রিকা নয়, আরও বহু অঞ্চলের আকারে বিকৃতি
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি শুধু আফ্রিকার ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। গোলাকার পৃথিবীকে দ্বিমাত্রিক মানচিত্রে তুলে ধরার সময় পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের আকার, দূরত্ব কিংবা আকৃতিতে কমবেশি বিকৃতি তৈরি হয়।
তবে আফ্রিকার ক্ষেত্রে এই পার্থক্যটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মহাদেশ হওয়া সত্ত্বেও প্রচলিত মানচিত্রে আফ্রিকাকে তার প্রকৃত আয়তনের তুলনায় অনেক ছোট দেখানো হয়।
এই কারণেই ‘কারেক্ট দ্য ম্যাপ’ প্রচারাভিযানের মূল লক্ষ্য হয়ে উঠেছে শিক্ষাব্যবস্থা, গণমাধ্যম এবং ডিজিটাল প্রযুক্তিতে এমন মানচিত্রের ব্যবহার বাড়ানো, যাতে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের প্রকৃত আয়তন সম্পর্কে মানুষের ধারণা আরও সঠিক হয়।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি সংস্থাগুলির উপর জোর
রাষ্ট্রসংঘের প্রস্তাবটি সরাসরি কোনও দেশ বা সংস্থার উপর বাধ্যতামূলক নিয়ম চাপিয়ে দিচ্ছে না। তবে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকাশনা সংস্থা, সংবাদমাধ্যম এবং প্রযুক্তি সংস্থাগুলিকে আরও সঠিক মাপের মানচিত্র ব্যবহারে উৎসাহিত করার বার্তা দিচ্ছে।
বিশেষ করে বর্তমান সময়ে যখন কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন মোবাইল ফোন, কম্পিউটার এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিশ্বের মানচিত্র দেখেন, তখন সঠিক ভূগোল তুলে ধরার বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
‘সঠিক মানচিত্র’ দেখানোর দাবি
আফ্রিকার পক্ষে এই প্রচারাভিযানের সঙ্গে যুক্ত সংগঠনগুলির বক্তব্য, শুধু রাষ্ট্রসংঘের নথিতে নয়, মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত মানচিত্রেও পৃথিবীর প্রকৃত অনুপাত প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন।
তাদের দাবি, স্কুল, পাঠ্যপুস্তক, সংবাদকক্ষ, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষ যে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করেন—সেখানেও যেন সঠিক অনুপাতের মানচিত্র দেখা যায়।
তাদের মতে, মানচিত্র শুধু ভৌগোলিক তথ্যের মাধ্যম নয়; এটি মানুষের পৃথিবীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিও তৈরি করে। তাই মানচিত্রে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা আয়তনের বিকৃতি সংশোধন করা গুরুত্বপূর্ণ।
রাষ্ট্রসংঘের সিদ্ধান্ত কতটা বদল আনবে?
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের এই প্রস্তাব আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়। ফলে বিশ্বের প্রতিটি দেশ বা প্রযুক্তি সংস্থাকে অবিলম্বে মারকেটর মানচিত্র সরিয়ে ফেলতেই হবে—এমন কোনও বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়নি।
তবে ১৬৪টি দেশের সমর্থন এই উদ্যোগের আন্তর্জাতিক গুরুত্বকে স্পষ্ট করেছে। ভবিষ্যতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রকাশনা সংস্থা, সংবাদমাধ্যম এবং ডিজিটাল ম্যাপ পরিষেবাগুলির মধ্যে আরও সঠিক আয়তন-ভিত্তিক মানচিত্র ব্যবহারের প্রবণতা বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, ‘কারেক্ট দ্য ম্যাপ’ প্রস্তাবকে শুধুমাত্র একটি মানচিত্র পরিবর্তনের উদ্যোগ হিসেবে নয়, বরং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলকে তাদের প্রকৃত ভৌগোলিক পরিসরের ভিত্তিতে দেখার একটি প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। দীর্ঘদিনের প্রচলিত মানচিত্র নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক স্তরে শুরু হওয়া এই বিতর্ক ভবিষ্যতে ভূগোল শিক্ষা ও ডিজিটাল মানচিত্র ব্যবহারে বড় পরিবর্তনের পথ খুলে দিতে পারে।
