ম্যাডিসন স্কোয়্যার গার্ডেনে মোহন ভাগবত, ঐক্যের বার্তা
নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়্যার গার্ডেনে মোহন ভাগবত ভারতের বৈচিত্র্য, হিন্দু-মুসলিম ঐক্য, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও মানবিক সহাবস্থানের বার্তা দেন।
ম্যাডিসন স্কোয়্যার গার্ডেনে মোহন ভাগবতের বার্তা, “ভারতের বৈচিত্র্যের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে ঐক্য”

নিউইয়র্ক, ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক ৩: ভারতের বৈচিত্র্য, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও মানবিক ঐক্যের বার্তা তুলে ধরলেন আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ঐতিহাসিক ম্যাডিসন স্কোয়্যার গার্ডেনে আয়োজিত ‘ইউনিভার্সাল ওয়াননেস সেলিব্রেশন’ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি ভারতের বহুত্ববাদী সংস্কৃতি এবং বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন।
ভাগবতের বক্তব্যে উঠে আসে ভারতের সমাজব্যবস্থায় বৈচিত্র্য ও ঐক্যের সম্পর্ক, ধর্মের প্রকৃত অর্থ, হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি এবং বিদেশে বসবাসকারী ভারতীয়দের দায়িত্বের মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ভারতের বৈচিত্র্যই ঐক্যের শক্তি
অনুষ্ঠানে মোহন ভাগবত বলেন, ভারতের মানুষের ডিএনএ-তেই ঐক্য ও বৈচিত্র্য নিহিত রয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি, সম্প্রদায় ও জীবনযাপনের পদ্ধতি ভারতকে দুর্বল করে না। বরং এই বৈচিত্র্যই ভারতের মৌলিক ঐক্যকে আরও সমৃদ্ধ করে।
তিনি বোঝানোর চেষ্টা করেন, পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্মের মানুষের উপাসনা পদ্ধতি ও আচার-অনুষ্ঠান আলাদা হতে পারে। কিন্তু সেই পথগুলির চূড়ান্ত লক্ষ্য মানবকল্যাণ এবং সত্যের অনুসন্ধান। অর্থাৎ পথ ভিন্ন হলেও মানবতার মূল সুর এক।
হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের ওপর জোর
ভাগবতের বক্তব্যে বিশেষভাবে উঠে আসে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রসঙ্গ। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি মনে করেন ভারতে কোনো মুসলিমের থাকা উচিত নয়, তিনি প্রকৃত অর্থে হিন্দু নন। তাঁর বক্তব্যে হিন্দুত্বকে একটি উদার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সাংস্কৃতিক ধারণা হিসেবে তুলে ধরা হয়।
তিনি বলেন, সত্য এক হলেও মানুষ নিজের চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সেই সত্যকে বিভিন্নভাবে উপলব্ধি করে। তাই ধর্মীয় বৈচিত্র্যকে বিরোধের কারণ হিসেবে না দেখে পরস্পরের পথ ও বিশ্বাসকে সম্মান করার প্রয়োজন রয়েছে।
‘ধর্ম’ মানে শুধু উপাসনা নয়
মোহন ভাগবত ধর্মের প্রচলিত ধারণা নিয়েও বক্তব্য রাখেন। তাঁর মতে, ‘ধর্ম’কে শুধুমাত্র কোনো নির্দিষ্ট পূজা-পদ্ধতি, আচার বা ধর্মীয় রীতিনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা উচিত নয়।
তাঁর ব্যাখ্যায়, যে মূল্যবোধ ব্যক্তি, সমাজ এবং প্রকৃতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখে এবং মানুষকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত রাখে, সেটিই ধর্মের বৃহত্তর অর্থ। সমাজে শান্তি, দায়িত্ববোধ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থান নিশ্চিত করাও ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রবাসী ভারতীয়দের উদ্দেশ্যে বিশেষ বার্তা
বিদেশে বসবাসকারী ভারতীয়দের প্রতিও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেন আরএসএস প্রধান। তিনি বলেন, যে দেশকে একজন ভারতীয় নিজের কর্মভূমি হিসেবে বেছে নিয়েছেন, সেই দেশের প্রতি তাঁর প্রথম কর্তব্য পালন করা উচিত। একইসঙ্গে নিজের ভারতীয় সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও ঐতিহ্যকেও ধরে রাখার আহ্বান জানান তিনি।
অর্থাৎ বিদেশে থেকেও নিজের সাংস্কৃতিক শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা এবং যে দেশের সমাজে বসবাস করছেন, সেই দেশের প্রতি দায়িত্বশীল থাকা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখার ওপর জোর দেন ভাগবত।
‘আশ্রয় দেওয়ার ঐতিহ্য’ মনে করালেন ভাগবত
বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে ভারতের ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা তুলে ধরেন তিনি। তাঁর দাবি, প্রাচীনকাল থেকেই ভারত বিভিন্ন সময়ে নিপীড়িত, নির্যাতিত ও আশ্রয়হীন মানুষের জন্য আশ্রয়ের জায়গা হয়ে উঠেছে।
এই মানবিক ও সহনশীল ঐতিহ্যকে ভবিষ্যতেও বজায় রাখা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করিয়ে দেন। তাঁর বক্তব্যে ধর্মীয় সম্প্রীতি, মানবিক মূল্যবোধ এবং পারস্পরিক সহাবস্থানের মাধ্যমে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বানই প্রধান হয়ে ওঠে।
নিউইয়র্কের মতো আন্তর্জাতিক মঞ্চে মোহন ভাগবতের এই বক্তব্যে ভারতের ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’-এর ধারণাই বিশেষভাবে সামনে এসেছে। ধর্ম, সংস্কৃতি ও মতের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও মানবতার বৃহত্তর স্বার্থে সকলকে একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার বার্তা দিয়েছেন তিনি।
