‘বসনিয়ার কসাই’ রাতকো ম্লাদিচের মৃত্যু, ৮৪ বছরে হেগের জেল হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস
বসনিয়া যুদ্ধের কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী রাতকো ম্লাদিচের ৮৪ বছর বয়সে দ্য হেগের জেল হাসপাতালে মৃত্যু। স্রেব্রেনিকা গণহত্যা ও সারায়েভো অবরোধে তাঁর ভূমিকা ছিল ভয়াবহ।
‘বসনিয়ার কসাই’ রাতকো ম্লাদিচের মৃত্যু, ৮৪ বছর বয়সে হেগের জেল হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক ৩ :
বসনিয়া যুদ্ধের অন্যতম কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী এবং সাবেক বসনিয়ান সার্ব জেনারেল রাতকো ম্লাদিচের মৃত্যু। ৮৪ বছর বয়সে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে থাকা জেল হাসপাতালে ২৭ আগস্ট তাঁর মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর সময় তিনি গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করছিলেন। জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত চলা বসনিয়া যুদ্ধের ভয়াবহতম অধ্যায়গুলির সঙ্গে ম্লাদিচের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। তাঁর নেতৃত্বাধীন বসনিয়ান সার্ব বাহিনীর বিরুদ্ধে সারায়েভো অবরোধ, বেসামরিক মানুষের ওপর নির্বিচার হামলা এবং ১৯৯৫ সালের স্রেব্রেনিকা গণহত্যায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছিল। এই কারণেই তিনি আন্তর্জাতিক মহলে ‘বসনিয়ার কসাই’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
⚖️ গণহত্যার দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড
রাতকো ম্লাদিচকে ২০১৭ সালে সাবেক যুগোস্লাভিয়ার জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICTY) গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। পরবর্তীতে আপিলেও সেই সাজা বহাল থাকে।
বিচার চলাকালীন ম্লাদিচ তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে আদালতের কর্তৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার শেষে তাঁর বিরুদ্ধে আনা গুরুতর অভিযোগগুলির বেশিরভাগই আদালতে প্রমাণিত হয়।
🩸 স্রেব্রেনিকা গণহত্যা—ইউরোপের ইতিহাসে ভয়াবহতম হত্যাযজ্ঞ
ম্লাদিচের নাম সবচেয়ে বেশি জড়িয়ে রয়েছে ১৯৯৫ সালের স্রেব্রেনিকা গণহত্যার সঙ্গে। জাতিসংঘ ঘোষিত ‘সেফ এরিয়া’ স্রেব্রেনিকা দখলের পর বসনিয়ান মুসলিম পুরুষ ও কিশোরদের ব্যাপকভাবে হত্যা করা হয়।
আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারে প্রমাণিত হয়, এই হত্যাকাণ্ডে অন্তত ৮,০০০-এর বেশি বসনিয়াক মুসলিম পুরুষ ও কিশোর নিহত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে সংঘটিত সবচেয়ে ভয়াবহ নৃশংস ঘটনাগুলির অন্যতম হিসেবে স্রেব্রেনিকা গণহত্যাকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
হত্যার পর বহু নিহতের দেহ গণকবর দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে প্রমাণ লোপাটের উদ্দেশ্যে কিছু মরদেহের অবস্থান পরিবর্তন করা হয় বলেও তদন্তে উঠে আসে। আজও স্রেব্রেনিকা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গণহত্যার স্মারক হিসেবে বিবেচিত।
🔥 ৪২ মাস ধরে সারায়েভো অবরোধ
ম্লাদিচের নেতৃত্বাধীন বাহিনীর আরেকটি ভয়াবহ কর্মকাণ্ড ছিল বসনিয়ার রাজধানী সারায়েভো অবরোধ। প্রায় ৪২ মাস ধরে শহরটি অবরুদ্ধ ছিল। সার্ব বাহিনীর গোলাবর্ষণ ও স্নাইপার হামলায় হাজার হাজার সাধারণ মানুষ প্রাণ হারান।
বিচারপ্রক্রিয়ায় উঠে আসে, শহরের বেসামরিক এলাকাগুলিকে লক্ষ্য করে গোলাবর্ষণ এবং স্নাইপার হামলা চালানো হয়েছিল। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক হিসাব অনুযায়ী, সারায়েভো অবরোধে প্রায় ১০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হন।
🕵️ ১৬ বছর পলাতক থাকার পর গ্রেফতার
যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও বহু বছর আন্তর্জাতিক বিচারের হাত থেকে পালিয়ে ছিলেন ম্লাদিচ। ১৯৯৫ সালে তাঁর বিরুদ্ধে প্রথম যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনা হলেও দীর্ঘ সময় তিনি গ্রেফতার হননি।
প্রায় ১৬ বছর পলাতক থাকার পর ২০১১ সালে সার্বিয়ায় তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর তাঁকে দ্য হেগে আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ আদালতের হাতে তুলে দেওয়া হয়। ২০১২ সালে তাঁর বিচার শুরু হয় এবং দীর্ঘ শুনানির পর ২০১৭ সালে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ঘোষণা করা হয়।
🕯️ মৃত্যু হলেও শেষ হয়নি বিতর্ক
ম্লাদিচের মৃত্যুতে বসনিয়া যুদ্ধের একটি রক্তাক্ত অধ্যায়ের অবসান ঘটলেও তাঁর উত্তরাধিকার নিয়ে বিতর্ক এখনও রয়েছে। যুদ্ধের শিকার পরিবার ও স্রেব্রেনিকার গণহত্যায় স্বজন হারানো মানুষদের কাছে তিনি একজন গণহত্যাকারী ও যুদ্ধাপরাধের প্রতীক।
অন্যদিকে, সার্ব জাতীয়তাবাদী মহলের একটি অংশ তাঁকে এখনও নিজেদের জনগোষ্ঠীর রক্ষক হিসেবে দেখে। তাঁর মৃত্যুর পরও এই দুই বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গি ফের সামনে এসেছে।
।
🌍 ইতিহাসে কীভাবে থেকে যাবে ম্লাদিচের নাম?
১৯৯২-৯৫ সালের বসনিয়া যুদ্ধের সময় এক লাখেরও বেশি মানুষ নিহত হন এবং লক্ষ লক্ষ মানুষ ঘরছাড়া হন। যুদ্ধের ভয়াবহতায় ভেঙে পড়ে বহুজাতিক যুগোস্লাভিয়ার পুরনো সামাজিক কাঠামো।
রাতকো ম্লাদিচ সেই যুদ্ধের অন্যতম প্রধান সামরিক চরিত্র ছিলেন। সারায়েভোর দীর্ঘ অবরোধ থেকে স্রেব্রেনিকার গণহত্যা—বসনিয়া যুদ্ধের একাধিক ভয়াবহ অধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর নাম যুক্ত। আদালতের রায়ে তাঁর অপরাধের দায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি কারাবন্দি ছিলেন।
২৭ আগস্ট ২০২৬ দ্য হেগের জেল হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু সেই দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার একটি শেষ অধ্যায় তৈরি করল। তবে স্রেব্রেনিকা ও বসনিয়ার নিহতদের স্মৃতি এবং সেই যুদ্ধের ক্ষত এখনও ইতিহাসের পাতায় গভীরভাবে রয়ে গেছে।
