নয়াদিল্লিতে শুরু ১৮তম ব্রিকস সম্মেলন, বৈশ্বিক অর্থনীতি-নিরাপত্তায় শীর্ষ নেতাদের বৈঠক
নয়াদিল্লিতে শুরু ১৮তম ব্রিকস সম্মেলন। বৈশ্বিক অর্থনীতি, নিরাপত্তা, বাণিজ্য, জ্বালানি, খাদ্য নিরাপত্তা, প্রযুক্তি ও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে শীর্ষ নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা।
নয়াদিল্লিতে শুরু ১৮তম ব্রিকস সম্মেলন, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তা নিয়ে শীর্ষ নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক

নয়াদিল্লি, ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক ৫ : ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির ভারত মণ্ডপমে আজ, শনিবার থেকে শুরু হচ্ছে ১৮তম ব্রিকস সম্মেলন। দুই দিনব্যাপী এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিশ্বের একাধিক উদীয়মান ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির রাষ্ট্রপ্রধান ও শীর্ষ নেতারা অংশ নিচ্ছেন। ভারতের ২০২৬ সালের ব্রিকস সভাপতিত্বের অধীনে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ।
ব্রাজিল, চীন, মিশর, ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, ইরান, রাশিয়া, সৌদি আরব, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত—এই ১১টি দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সদস্য দেশগুলির মধ্যে আলোচনা ও মতবিনিময়ের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ক্ষেত্রেও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত উঠে আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
ভারতের সভাপতিত্বে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে সহযোগিতা
২০২৬ সালে ব্রিকসের সভাপতিত্ব করছে ভারত। সেই সূত্রেই নয়াদিল্লিতে আয়োজিত এবারের সম্মেলনের দিকে বিশেষ নজর রয়েছে আন্তর্জাতিক মহলের। সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য—‘বিল্ডিং ফর রেজিলিয়েন্স, ইনোভেশন, কোঅপারেশন অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি’। অর্থাৎ বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় স্থিতিস্থাপকতা তৈরি, নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং টেকসই উন্নয়নের উপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে যখন একের পর এক ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে, সেই সময়ে ব্রিকসের মতো গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে সদস্য দেশগুলির শীর্ষ নেতৃত্বের বৈঠক যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্য ও কৃষ্ণসাগর অঞ্চলের সংঘাত নিয়ে আলোচনা
এবারের ব্রিকস সম্মেলনে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য এবং কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে চলমান সংঘাতের প্রভাব নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই সংঘাতগুলির প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ, পরিবহণ ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে। ফলে যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক অস্থিরতা কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, তা নিয়েও সদস্য দেশগুলির মধ্যে মতবিনিময় হতে পারে।
বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা ও বহুপাক্ষিকতায় জোর
ব্রিকস সম্মেলনে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থায় উন্নয়নশীল দেশগুলির ভূমিকা আরও শক্তিশালী করার বিষয়টিও গুরুত্ব পেতে পারে। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলিতে উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলির প্রতিনিধিত্ব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
এর পাশাপাশি বহুপাক্ষিক সহযোগিতা আরও কার্যকর করা, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি এবং উন্নয়নশীল দেশগুলির স্বার্থকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার বিষয়েও আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা
ব্রিকসের সদস্য দেশগুলির মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়টিও এবারের সম্মেলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা। বিভিন্ন দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও বাড়ানো, বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি করা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা আনার মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
পাশাপাশি প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও পারস্পরিক সহযোগিতার উপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো ভবিষ্যতের অর্থনীতিকে কীভাবে প্রভাবিত করবে, সেই বিষয়গুলিও আলোচনার কেন্দ্রে আসতে পারে।
খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তায় বিশেষ নজর
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা ক্রমশ বাড়ছে। সেই পরিস্থিতিতে ব্রিকস সম্মেলনে খাদ্য নিরাপত্তা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে বিশেষ আলোচনা হওয়ার কথা।
নিরাপদ ও স্থিতিশীল সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা কমানো এবং ভবিষ্যতের জন্য টেকসই খাদ্য ও শক্তি ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাওয়ার মতো বিষয়গুলিকে গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে।
স্বাস্থ্যসেবা ও সরবরাহ শৃঙ্খল নিয়েও আলোচনা
আন্তর্জাতিক সংকটের সময় ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের সরবরাহ যাতে ব্যাহত না হয়, সেই বিষয়টিও এবারের আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে। বিশেষ করে সংকটপূর্ণ সরবরাহ শৃঙ্খলকে আরও শক্তিশালী করার উপায় নিয়ে সদস্য দেশগুলির মধ্যে মতবিনিময়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবায় সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক স্তরে বড় ধরনের স্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় যৌথ প্রস্তুতি গড়ে তোলার বিষয়টিও আলোচনার অংশ হতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ
জলবায়ু পরিবর্তনও এবারের ব্রিকস সম্মেলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পরিবেশের উপর ক্রমবর্ধমান চাপ, চরম আবহাওয়ার ঘটনা এবং টেকসই উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার কথা মাথায় রেখে সদস্য দেশগুলির মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়টি সামনে আসতে পারে।
সব মিলিয়ে নয়াদিল্লিতে শুরু হওয়া ১৮তম ব্রিকস সম্মেলন শুধু সদস্য দেশগুলির অর্থনৈতিক সহযোগিতার মঞ্চ নয়, বরং বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যে নতুন আন্তর্জাতিক সমন্বয় ও সহযোগিতার দিকনির্দেশ নির্ধারণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।।
