২০ বিদ্রোহী তৃণমূল সাংসদকে লোকসভা সচিবালয়ের নোটিশ, ৭ দিনের মধ্যে জবাব
দলত্যাগ বিরোধী আইনে অযোগ্য ঘোষণার দাবিতে ২০ বিদ্রোহী তৃণমূল সাংসদকে লোকসভা সচিবালয়ের নোটিশ। ৭ দিনের মধ্যে জবাব তলব, এরপর স্পিকারের সিদ্ধান্ত।
২০ বিদ্রোহী তৃণমূল সাংসদকে লোকসভা সচিবালয়ের নোটিশ, ৭ দিনের মধ্যে জবাব তলব
নয়াদিল্লি, ন্যাশনাল ডেস্ক ১৪ : তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরের রাজনৈতিক সংঘাত এবার পৌঁছে গেল সংসদীয় আইনি লড়াইয়ের আরও গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে। দলত্যাগ বিরোধী আইনে অযোগ্য ঘোষণার দাবিতে দায়ের করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০ জন বিদ্রোহী তৃণমূল সাংসদকে নোটিশ পাঠাল লোকসভা সচিবালয়। নোটিশে সংশ্লিষ্ট সাংসদদের আগামী সাত দিনের মধ্যে লিখিত জবাব বা নিজেদের বক্তব্য জমা দিতে বলা হয়েছে।

এই পদক্ষেপের নেপথ্যে রয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক ও লোকসভায় দলের নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দায়ের করা অযোগ্যতার আবেদন। ওই ২০ সাংসদ অন্য রাজনৈতিক গোষ্ঠী, ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টি অফ ইন্ডিয়া (NCPI)-এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ তুলে তাঁদের বিরুদ্ধে সংবিধানের দশম তফশিলের অধীনে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছিল তৃণমূল।
নোটিশে সাত দিনের সময়
লোকসভা সচিবালয়ের জারি করা নোটিশগুলির তারিখ ২৫ আগস্ট। ১৯৮৫ সালের Members of Lok Sabha (Disqualification on Ground of Defection) Rules-এর Rule 6-এর অধীনে নোটিশ পাঠানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সাংসদদের অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দায়ের করা আবেদনের বিষয়ে তাঁদের মন্তব্য জানাতে বলা হয়েছে। নোটিশ পাওয়ার সাত দিনের মধ্যে জবাব জমা দিতে হবে।
অর্থাৎ, এই পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট সাংসদদের বক্তব্যও সংসদীয় প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে উঠতে চলেছে। তাঁদের জবাব পাওয়ার পর লোকসভার স্পিকার পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
কী অভিযোগ তৃণমূলের?
তৃণমূলের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট ২০ জন সাংসদ দলের টিকিটে নির্বাচিত হওয়ার পর পরবর্তীতে NCPI-এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে দলত্যাগ বিরোধী আইনে সদস্যপদ খারিজের আবেদন করা হয়।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ১৮ জুন ২০২৬ তারিখে সংশ্লিষ্ট সাংসদদের বিরুদ্ধে পৃথকভাবে আবেদন করেছিলেন বলে একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তৃণমূলের বক্তব্য, অন্য রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে এইভাবে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি সংবিধানের দশম তফশিলের আওতায় পড়ে কি না, সেটিই এখন স্পিকারের বিবেচনার বিষয়।
স্পিকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল তৃণমূল
অভিযোগ দায়ের হওয়ার পর দীর্ঘ সময় ধরে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়ায় তৃণমূল কংগ্রেস সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়। দলের অভিযোগ ছিল, লোকসভার স্পিকারের কাছে আবেদন জমা দেওয়ার পরও বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তি করা হয়নি।
এই বিলম্বের বিরুদ্ধেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় শীর্ষ আদালতে আবেদন করেন এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়। ২৫ আগস্ট সুপ্রিম কোর্ট মামলাটি শুনতে সম্মত হয় এবং ২০ বিদ্রোহী সাংসদের বিষয়ে নোটিশ জারি করে।
শুনানির সময় আদালতের পর্যবেক্ষণের মূল বিষয় ছিল শুধু নোটিশ দেওয়া হয়েছে কি না তা নয়, বরং দলত্যাগ সংক্রান্ত পুরো প্রক্রিয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত সময়ের মধ্যে শেষ করা যায়।
সুপ্রিম কোর্টে কী হয়েছিল?
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে মামলাটি শুনানি হয়। বেঞ্চে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি. মোহনা ছিলেন। শুনানির সময় স্পিকারের তরফে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতকে জানান যে ২০ জন সাংসদকে ইতিমধ্যেই নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
এরপরই লোকসভা সচিবালয়ের নোটিশের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। ফলে তৃণমূলের দায়ের করা অযোগ্যতার আবেদনে সংসদীয় স্তরে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া আরও এক ধাপ এগোল।
বিদ্রোহী সাংসদদের অবস্থান কী?
অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট বিদ্রোহী সাংসদরা নিজেদের অবস্থান নিয়ে কী ব্যাখ্যা দেবেন, সেটাই এখন নজরে। তাঁদের জবাবের উপর পরবর্তী সংসদীয় প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ নির্ভর করবে।
তাঁরা অন্য রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি কীভাবে ব্যাখ্যা করেন এবং দলত্যাগ বিরোধী আইনের অভিযোগের বিরুদ্ধে কী আইনি ও সাংবিধানিক যুক্তি তুলে ধরেন, তা আগামী সাত দিনের মধ্যে স্পষ্ট হতে পারে।
এখন কী হবে?
এখন ২০ জন সাংসদের হাতে মূলত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে—অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দায়ের করা অভিযোগের জবাব দেওয়া, নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করা এবং দলত্যাগ বিরোধী আইনে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত নয় বলে যুক্তি থাকলে তা নথিপত্রসহ তুলে ধরা।
এরপর সংশ্লিষ্ট জবাবগুলি বিবেচনা করে লোকসভার স্পিকার পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করবেন। তাই নোটিশ জারি হওয়া মানেই সাংসদদের সদস্যপদ খারিজ হয়ে যাওয়া নয়; এটি অযোগ্যতার অভিযোগ নিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
সব মিলিয়ে, ২০ বিদ্রোহী তৃণমূল সাংসদকে লোকসভা সচিবালয়ের এই নোটিশ বাংলার রাজনীতিতে নতুন করে চাঞ্চল্য তৈরি করেছে। একদিকে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ, অন্যদিকে সাত দিনের মধ্যে সাংসদদের জবাব তলব—দুই ঘটনাই ইঙ্গিত দিচ্ছে, এই দলত্যাগ বিরোধী মামলাটি এবার দ্রুত রাজনৈতিক ও আইনি গুরুত্ব পেতে চলেছে।
