মা-হারা গণ্ডার শাবকের বারবার লোকালয়ে হানা, আতঙ্ক আলিপুরদুয়ারে
মা-হারা গণ্ডার শাবক বারবার লোকালয় ও চা-বাগানে ঢুকে পড়ায় আতঙ্ক আলিপুরদুয়ারে। ১০-১১ ঘণ্টার অভিযানে উদ্ধারের পর ফের লোকালয়ে শাবক।
মা-হারা গণ্ডার শাবকের বারবার লোকালয়ে হানা
আলিপুরদুয়ার, এনভায়রনমেন্টাল ডেস্ক ১২ : জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যান সংলগ্ন এলাকায় ফের বন্যপ্রাণী-মানুষ সংঘাতের আশঙ্কা। আলিপুরদুয়ারের ফালাকাটা ব্লকের কুঞ্জনগর এবং মাদারিহাট এলাকায় একটি মা-হারা গণ্ডার শাবকের বারবার লোকালয়ে ঢুকে পড়ার ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়েছে। আনুমানিক এক থেকে দেড় বছর বয়সী ওই শাবকটি কখনও গ্রাম, কখনও চা-বাগান এলাকায় ঢুকে পড়ায় উদ্বিগ্ন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, কিছুদিন আগে জলদাপাড়া জঙ্গল থেকে একটি পুরুষ গণ্ডারের তাড়া খেয়ে মা গণ্ডারটি তার শাবককে নিয়ে কুঞ্জনগর এলাকায় ঢুকে পড়েছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা তৈরি হয়। পরে অতিরিক্ত আতঙ্ক ও ধকলের জেরে মা গণ্ডারটির মৃত্যু হয় বলে জানা গিয়েছে। এরপর থেকেই কার্যত অনাথ হয়ে পড়ে ছোট্ট গণ্ডার শাবকটি।
পুরুষ গণ্ডারের তাড়া খেয়ে লোকালয়ে প্রবেশ
ঘটনার সূত্রপাত জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানের জঙ্গল এলাকায়। একটি পুরুষ গণ্ডারের তাড়া খেয়ে মা গণ্ডার ও তার শাবক জঙ্গল ছেড়ে কুঞ্জনগর গ্রামের দিকে চলে আসে। হঠাৎ লোকালয়ে বিশালাকার গণ্ডার ঢুকে পড়ায় মুহূর্তের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বন দপ্তরের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছন। তবে লোকালয়ের ভিড়, মানুষের চিৎকার এবং তীব্র উত্তেজনার মধ্যে মা গণ্ডারটি আরও আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে অতিরিক্ত আতঙ্ক এবং হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তার মৃত্যু হয় বলে বন দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে।
মায়ের মৃত্যুর পর শাবকটি সম্পূর্ণভাবে একা হয়ে যায়। স্বাভাবিকভাবেই জঙ্গলে ফিরে গেলেও মায়ের অনুপস্থিতিতে তার আচরণে অস্বাভাবিকতা দেখা যাচ্ছে বলে মনে করছেন বনকর্মী ও স্থানীয়রা।
১০-১১ ঘণ্টার অভিযানে উদ্ধার শাবক
মা গণ্ডারের মৃত্যুর পর দিশেহারা শাবকটিকে নিরাপদে জঙ্গলে ফিরিয়ে দিতে উদ্যোগ নেয় বন দপ্তর। দীর্ঘ প্রস্তুতির পর চারটি কুনকি হাতি নামিয়ে শুরু হয় উদ্ধার অভিযান।
প্রায় ১০ থেকে ১১ ঘণ্টা ধরে চলে রুদ্ধশ্বাস উদ্ধার অভিযান। দীর্ঘ চেষ্টার পর বনকর্মীরা শাবকটিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন। এরপর তাকে জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানের গভীর জঙ্গলে নিরাপদ জায়গায় ছেড়ে দেওয়া হয়।
বন দপ্তরের আশা ছিল, জঙ্গলের পরিবেশে ফিরে গেলে শাবকটি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক আচরণে ফিরে আসবে এবং লোকালয়ে আসার প্রবণতা কমবে।
ফের চা-বাগানে ঢুকে পড়ল শাবক
কিন্তু সেই আশায় ফের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই গত রবিবার সকালে শাবকটি আবার পূর্ব মাদারিহাটের একটি চা-বাগানে ঢুকে পড়ে।
চা-বাগান এলাকায় ছোট গণ্ডারটিকে দেখতে পাওয়ার পর দ্রুত খবর ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। অনেকেই গণ্ডারটিকে দেখতে ঘটনাস্থলের দিকে ছুটে যান। এর ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বন দপ্তরের কর্মীরা শাবকটির গতিবিধির উপর নজর রাখছেন। কারণ মা-হারা এবং এখনও বয়সে ছোট এই গণ্ডারটি ভয় পেলে আচমকা আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে। একইসঙ্গে মানুষের ভিড় বা উত্তেজনা শাবকটির জন্যও বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
কেন বারবার লোকালয়ে আসছে?
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, মা-হারা এই শাবকটির স্বাভাবিক চলাফেরা এবং খাদ্য সংগ্রহের অভ্যাস এখনও পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। মায়ের সঙ্গে থাকার সময় যে পথ, খাদ্যের উৎস এবং নিরাপদ এলাকা সম্পর্কে সে শিখত, মায়ের মৃত্যুর পর সেই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়েছে।
ফলে জঙ্গলের মধ্যে দিশেহারা হয়ে শাবকটি পরিচিত পথের পরিবর্তে লোকালয় বা চা-বাগানের দিকে চলে আসতে পারে। চা-বাগান ও জঙ্গল সংলগ্ন এলাকা অনেক সময় গণ্ডারের চলাচলের প্রাকৃতিক করিডরের কাছাকাছি হওয়ায় এমন ঘটনাও ঘটে।
বন দপ্তরের নজরদারি বাড়ানোর দাবি
শাবকটির বারবার লোকালয়ে ঢুকে পড়ার ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ বন দপ্তরের কাছে আরও নজরদারি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। বিশেষ করে রাত ও ভোরের দিকে চা-বাগান এবং জঙ্গল সংলগ্ন এলাকায় নজরদারি বাড়ানোর দাবি উঠেছে।
তবে একইসঙ্গে বনকর্মীদের কাজেও স্থানীয়দের সহযোগিতা করা প্রয়োজন বলে মনে করা হচ্ছে। বন্যপ্রাণীকে ঘিরে অতিরিক্ত ভিড় তৈরি হলে উদ্ধার অভিযান যেমন কঠিন হয়ে পড়ে, তেমনই মানুষের পাশাপাশি প্রাণীটির জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
গণ্ডার দেখলে কী করবেন?
লোকালয়ে গণ্ডার বা অন্য কোনও বন্যপ্রাণী ঢুকে পড়লে সাধারণ মানুষকে অত্যন্ত সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
কোনওভাবেই গণ্ডারকে ঢিল ছোড়া, তাড়া করা বা চিৎকার করে উত্তেজিত করা যাবে না।
প্রাণীটির কাছাকাছি গিয়ে ছবি বা সেলফি তোলার চেষ্টা করা বিপজ্জনক।
গণ্ডার দেখতে পেলে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে দ্রুত বন দপ্তর বা পুলিশকে খবর দিতে হবে।
উদ্ধার অভিযান চলাকালীন ঘটনাস্থলে ভিড় করা বা হইচই করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
বন দপ্তরের নির্দেশ না মেনে প্রাণীটির গতিপথ আটকানো বা তাকে জঙ্গলের দিকে তাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত নয়।
জলদাপাড়া সংলগ্ন এলাকায় মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সহাবস্থান দীর্ঘদিনের। কিন্তু মা-হারা এই ছোট্ট গণ্ডার শাবকের বারবার লোকালয়ে ঢুকে পড়ার ঘটনা নতুন করে সেই সংঘাতের আশঙ্কা বাড়িয়েছে। তাই শাবকটিকে নিরাপদে জঙ্গলে ফিরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদেরও সুরক্ষিত রাখা এখন বন দপ্তরের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।
