রাজ আমলের তল্লী গাছকে ভাই বানিয়ে কোচবিহারে অভিনব ‘গাছ বন্ধন’ উৎসব
রাখিবন্ধনে কোচবিহারে অভিনব ‘গাছ বন্ধন’ উৎসব। রাজ আমলের তল্লী গাছে রাখি পরিয়ে পরিবেশ রক্ষার বার্তা দিলেন পিংকি রায়। শিশুদের হাতে তুলে দেওয়া হল চারা গাছ।
রাজ আমলের তল্লী গাছকে ভাই বানিয়ে কোচবিহারে অভিনব ‘গাছ বন্ধন’ উৎসব
কোচবিহার, ডিস্ট্রিক্ট ডেস্ক ৭ : ভাই-বোনের ভালোবাসার প্রতীক রাখিবন্ধন উৎসবকে পরিবেশ রক্ষার বার্তায় নতুন মাত্রা দিলেন কোচবিহারের পরিবেশপ্রেমী পিংকি রায়।
দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য মেনে এ বছরও রাজ আমলের স্মৃতি বহনকারী তল্লী গাছকে ‘ভাই’ হিসেবে বরণ করে তার হাতে রাখি পরিয়ে গাছের দীর্ঘায়ু কামনা করলেন তিনি। পাশাপাশি ছোট ছোট শিশু ও স্থানীয় মহিলাদের সঙ্গে নিয়ে শহরের বিভিন্ন গাছেও রাখি পরিয়ে পরিবেশ রক্ষার সচেতনতার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হয়।

ভাই যেমন বোনের হাতে রাখি পরিয়ে তার নিরাপত্তা ও দীর্ঘায়ু কামনা করেন, তেমনই কোচবিহারে পরিবেশপ্রেমী মানুষেরা দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে গাছকে ভাইয়ের মর্যাদা দিয়ে রাখি পরিয়ে আসছেন। সেই ভাবনাকেই সামনে রেখে এবারও আয়োজন করা হয় অভিনব ‘গাছ বন্ধন’ উৎসবের।
এই বিশেষ উদ্যোগে রাজ আমলের ঐতিহ্যবাহী তল্লী গাছটিকে সুন্দরভাবে সাজিয়ে পিংকি রায়ের নিজের হাতে তৈরি রাখি পরানো হয়। শুধু একটি গাছেই নয়, আশপাশের একাধিক গাছেও রাখি পরিয়ে সবুজ রক্ষা ও বৃক্ষ সংরক্ষণের বার্তা দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া বিভিন্ন বোন, দিদি এবং পরিবেশপ্রেমীরাও নিজেদের হাতে গাছগুলিতে রাখি পরান এবং এই উদ্যোগকে সফল করে তোলেন।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল পথচলতি সাধারণ মানুষের হাতে রাখি পরিয়ে তাঁদের হাতে একটি করে চারা গাছ তুলে দেওয়া। এর মাধ্যমে রাখিবন্ধনের সঙ্গে বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ সংরক্ষণের বার্তাকেও যুক্ত করা হয়।
আয়োজকদের বক্তব্য, একটি গাছকে রক্ষা করা মানে শুধু একটি গাছকে বাঁচানো নয়, বরং আগামী প্রজন্মের জন্য পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যকে সুরক্ষিত রাখা।
এদিন ছোট ছোট শিশুদের মধ্যেও পরিবেশ সচেতনতা গড়ে তোলার বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরিবেশপ্রেমী পিংকি রায়ের নিজের হাতে তৈরি বিশেষ রাখি শিশুদের পরিয়ে দেওয়া হয়। সেই রাখিতে লেখা ছিল— ‘মোবাইল ছাড়ো, বই পড়ো’। শিশুদের মোবাইলের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি কমিয়ে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার বার্তাও এই আয়োজনের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানে বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। শিশুদের পাশাপাশি শিক্ষক, সমাজকর্মী এবং পরিবেশপ্রেমীরাও এই উদ্যোগে অংশ নেন। উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট সমাজকর্মী ও শিক্ষক বিপ্লব তালুকদার। এছাড়াও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আস্থা ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন সদস্যবৃন্দ। তাঁদের সক্রিয় সহযোগিতায় গাছ বন্ধন উৎসব আরও সুন্দর ও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
পিংকি রায়ের এই উদ্যোগকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের মধ্যেও উৎসাহ দেখা যায়। রাখিবন্ধনের মতো একটি সামাজিক ও আবেগঘন উৎসবকে পরিবেশ রক্ষার সঙ্গে যুক্ত করে তিনি যে বার্তা দিতে চেয়েছেন, তা সাধারণ মানুষের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে শিশুদের হাতে চারা গাছ তুলে দেওয়া এবং গাছকে পরিবারের একজন সদস্যের মতো ভালোবাসার আহ্বান এই কর্মসূচির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।
আয়োজকদের মতে, শুধু নির্দিষ্ট একটি দিনে গাছকে রাখি পরালেই দায়িত্ব শেষ নয়। সারা বছর গাছের যত্ন নেওয়া, নতুন গাছ লাগানো এবং অকারণে গাছ কাটা বন্ধ করার বিষয়ে মানুষকে সচেতন করাই এই ‘গাছ বন্ধন’ উৎসবের মূল উদ্দেশ্য। রাজ আমলের ঐতিহ্যবাহী তল্লী গাছকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই উদ্যোগ তাই ক্রমেই কোচবিহারের একটি বিশেষ পরিবেশবান্ধব বার্তাবাহী কর্মসূচিতে পরিণত হচ্ছে।
রাখিবন্ধনের আবেগকে কাজে লাগিয়ে গাছের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার এই উদ্যোগে উঠে এসেছে একটাই বার্তা— গাছ বাঁচলে পরিবেশ বাঁচবে, আর পরিবেশ বাঁচলেই সুরক্ষিত থাকবে আগামী প্রজন্ম। কোচবিহারের মাটিতে তাই ভাইয়ের হাতে রাখির পাশাপাশি এবারও গাছের গায়েও উঠল ভালোবাসার বন্ধন।
