কোচবিহারে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে দু’দিনের সক্ষমতা উন্নয়ন কর্মশালা
কোচবিহারে বন বিভাগ ও SPOAR-এর উদ্যোগে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন, পাচার প্রতিরোধ, তল্লাশি, বাজেয়াপ্তকরণ ও মামলা পরিচালনা নিয়ে দু’দিনের কর্মশালা।
কোচবিহারে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে দু’দিনের সক্ষমতা উন্নয়ন কর্মশালা
কোচবিহার, ২২ আগস্ট: বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন, ১৯৭২ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আইনি বিধান সম্পর্কে বনকর্মীদের দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়াতে কোচবিহারে শুরু হল দু’দিনের বিশেষ সক্ষমতা উন্নয়ন কর্মশালা। কোচবিহার বন বিভাগ ও SPOAR-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মশালা ২২ ও ২৩ আগস্ট অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ, বেআইনি বন্যপ্রাণী পাচার প্রতিরোধ, তল্লাশি ও বাজেয়াপ্তকরণ প্রক্রিয়া এবং আদালতে মামলা পরিচালনার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়ে কর্মশালায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী বনকর্মীদের আইনি জ্ঞান ও বাস্তব দক্ষতা বাড়ানোই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
কর্মশালায় বন্যপ্রাণী সংক্রান্ত অপরাধের ক্ষেত্রে সঠিকভাবে মামলা নথিভুক্ত করা, বাজেয়াপ্ত সামগ্রীর তালিকা বা সিজার লিস্ট তৈরি, গ্রেফতার মেমো প্রস্তুত, অভিযুক্তের বয়ান গ্রহণ এবং আদালতে প্রয়োজনীয় নথিপত্র উপস্থাপনের মতো বিষয় নিয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
প্রথম দিনে আইনি নথিপত্র তৈরির অনুশীলন
২২ আগস্ট কর্মশালার প্রথম দিন রেজিস্ট্রেশন ও উদ্বোধনী পর্বের মাধ্যমে শুরু হয়। এরপর একটি কাল্পনিক বন্যপ্রাণী অপরাধের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন আইনি নথিপত্র তৈরির অনুশীলন করানো হয়। এর মধ্যে ছিল লেবেল তৈরি, সিজার লিস্ট এবং গ্রেফতার মেমো প্রস্তুত। এই পর্ব পরিচালনা করেন আইনজীবী সমীর মজুমদার এবং এস. পি. পাণ্ডে।
এরপর বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ) আইন, ১৯৭২ এবং ২০২২ সালের সংশোধনী নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। আইনের গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা, বিভিন্ন ধারার প্রয়োগ, বন আধিকারিকদের ক্ষমতা, অপরাধ ও শাস্তির বিধান এবং সংশ্লিষ্ট আইনি ব্যবস্থাগুলি নিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
মক কোর্টে বাস্তব পরিস্থিতির অনুশীলন
প্রশিক্ষণার্থীদের বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ করে মক কোর্ট বা আদালতভিত্তিক অনুশীলনের জন্য প্রস্তুত করা হয়। এর মাধ্যমে বাস্তব পরিস্থিতিতে বন্যপ্রাণী অপরাধের একটি মামলা কীভাবে পরিচালনা করতে হয়, সে বিষয়ে ব্যবহারিক ধারণা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রথম দিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় ছিল অবৈধ বন্যপ্রাণী বাণিজ্যে সরীসৃপ ও অন্যান্য প্রাণীর ব্যবহার। কচ্ছপ ও কাছিম পাচার, সাপ ও সাপের বিষের অবৈধ বাণিজ্য এবং উত্তরবঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ চিকেনস নেক অঞ্চল দিয়ে বন্যপ্রাণী পাচারের সম্ভাব্য রুট নিয়েও আলোচনা হয়। এই পর্বে প্রশিক্ষণ দেন এস. পি. পাণ্ডে।
এছাড়াও ইন্ডিয়ান ফরেস্ট অ্যাক্ট, ১৯২৭-এর গুরুত্বপূর্ণ ধারাগুলি এবং ওই আইনের অধীনে বন আধিকারিকদের ক্ষমতা নিয়ে আলোচনা করা হয়। দিনের শেষে প্রশ্নোত্তর ও আলোচনা পর্বে অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন আইনি সংশয় দূর করা হয়।
দ্বিতীয় দিনে তল্লাশি ও বাজেয়াপ্তকরণে গুরুত্ব
২৩ আগস্ট কর্মশালার দ্বিতীয় দিনে তল্লাশি ও বাজেয়াপ্তকরণ প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা রয়েছে। বন্যপ্রাণী সংক্রান্ত অপরাধের ঘটনায় আইন মেনে কীভাবে তল্লাশি চালাতে হবে এবং বাজেয়াপ্ত সামগ্রী কীভাবে যথাযথভাবে নথিভুক্ত করতে হবে, তা হাতে-কলমে শেখানো হবে।
লেবেল, সিজার লিস্ট, গ্রেফতার মেমো, স্কেচ ম্যাপ, অভিযুক্তের বয়ান, ফরওয়ার্ডিং নোট এবং POR/অভিযোগ দায়েরের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি মামলা নথিভুক্ত হওয়ার পর থেকে আদালতে বিচার ও রায় ঘোষণা পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপ নিয়ে আলোচনা হবে।
কোনও বিদেশি নাগরিক বন্যপ্রাণী অপরাধে জড়িত থাকলে কী ধরনের আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়, সেই বিষয়টিও দ্বিতীয় দিনের প্রশিক্ষণে তুলে ধরা হবে।
মক কোর্টে কাল্পনিক মামলা পরিচালনা
দ্বিতীয় দিনের অন্যতম আকর্ষণ হতে চলেছে মক কোর্ট গ্রুপ অ্যাক্টিভিটি। প্রশিক্ষণার্থীদের কয়েকটি দলে ভাগ করে বাস্তব আদালতের পরিবেশের আদলে একটি কাল্পনিক মামলা পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে আইনি নথিপত্র প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে আদালতে মামলার বিভিন্ন পর্যায় সম্পর্কে ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন অংশগ্রহণকারীরা।
কর্মশালার শেষ পর্যায়ে মক কোর্টের কার্যক্রম পর্যালোচনা, পোস্ট-ইভ্যালুয়েশন এবং অংশগ্রহণকারীদের মতামত গ্রহণ করা হবে। এরপর ভ্যালেডিক্টরি সেশনে গ্রুপ অ্যাক্টিভিটির বিজয়ীদের ঘোষণা, বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং ধন্যবাদ জ্ঞাপনের মাধ্যমে দু’দিনের কর্মশালার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি হবে।
বন দফতর ও SPOAR-এর এই উদ্যোগের ফলে বন্যপ্রাণী অপরাধ মোকাবিলায় মাঠপর্যায়ের কর্মীদের আইনি দক্ষতা আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করা হচ্ছে। উত্তরবঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক সীমান্তবর্তী এলাকার কারণে বন্যপ্রাণী পাচার প্রতিরোধে দ্রুত ও আইনসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে এই ধরনের প্রশিক্ষণ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
