হায়দরাবাদ গাড়ি দুর্ঘটনায় রাজনৈতিক ঝড়, সাংসদ-পুত্রকে ঘিরে তীব্র বিতর্ক
হায়দরাবাদের অ্যাস্টন মার্টিন দুর্ঘটনায় সাংসদ-পুত্রকে ঘিরে বিতর্ক। গ্রেফতার না করা, রাজনৈতিক প্রভাব, CCTV ও তদন্ত নিয়ে উঠছে একাধিক প্রশ্ন।
হায়দরাবাদের গাড়ি দুর্ঘটনায় রাজনৈতিক ঝড়, সাংসদ-পুত্রকে ঘিরে তীব্র বিতর্ক
হায়দরাবাদ, ন্যাশনাল ডেস্ক : হায়দরাবাদের মাধাপুরে বিলাসবহুল অ্যাস্টন মার্টিন গাড়ির ভয়াবহ দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে এবার রাজনৈতিক উত্তাপও চরমে। গত ১৬ আগস্ট ইনরবিট মলের কাছে দ্রুতগতির একটি অ্যাস্টন মার্টিনের ধাক্কায় মৃত্যু হয় ওড়িশার বাসিন্দা ২৬ বছর বয়সি ভারতী মুখীর। দুর্ঘটনায় অভিযুক্ত ২১ বছর বয়সি লিঙ্গামানেনি সঞ্জুশ। তিনি অন্ধ্রপ্রদেশের শাসক জোটের শরিক জনসেনা পার্টির রাজ্যসভার সাংসদ ও শিল্পপতি লিঙ্গামানেনি রমেশের ছেলে।

ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা এবং তাঁকে গ্রেফতার না করা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অন্যদিকে, সাংসদ বাবা ছেলের পাশে দাঁড়িয়ে দাবি করেছেন, তদন্তে কোনও ধরনের প্রভাব খাটানো হয়নি এবং তাঁর ছেলে শুরু থেকেই পুলিশের সঙ্গে সহযোগিতা করছেন। এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের জেরে দুর্ঘটনাটি এখন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে।
ছেলের পক্ষে সাংসদ বাবার সাফাই
লিঙ্গামানেনি রমেশ তাঁর ছেলের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, দুর্ঘটনার পর থেকেই সঞ্জুশ তদন্তকারী আধিকারিক এবং সাইবারাবাদ পুলিশের সঙ্গে সহযোগিতা করছেন।
সাংসদের বক্তব্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার পর সঞ্জুশ ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেননি। বরং আহত ভারতী মুখীকে নিজের গাড়িতে করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এই বিষয়টিকে তিনি ছেলের মানবিক আচরণের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
পাশাপাশি রমেশের দাবি, তাঁরা আইনের ঊর্ধ্বে নন। পুলিশ যে নোটিশ দিয়েছে, তারও আইন মেনেই জবাব দেওয়া হচ্ছে। তদন্তে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
কোন ধারায় মামলা?
মাধাপুর থানার পুলিশ এই ঘটনায় সঞ্জুশের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা বা BNS-এর ১০৬(১) ধারা অনুযায়ী মামলা দায়ের করেছে। বেপরোয়া বা অবহেলাজনিতভাবে গাড়ি চালিয়ে মৃত্যুর ঘটনায় এই ধারায় মামলা করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
তবে এই ঘটনায় সঞ্জুশকে গ্রেফতার করা হয়নি। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযোগটি জামিনযোগ্য এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাজা সাত বছরের কম হওয়ায় তাঁকে গ্রেফতারের পরিবর্তে BNSS-এর ৩৫(৩) ধারায় নোটিশ দেওয়া হয়েছে। পরে তিনি থানায় জামিনও পেয়েছেন।
এই গ্রেফতার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েই রাজনৈতিক মহলে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
অ্যালকোহল ও ড্রাগ টেস্টে প্রাথমিক রিপোর্ট নেগেটিভ
দুর্ঘটনার পর চালকের মদ্যপান বা মাদক গ্রহণের বিষয়টিও খতিয়ে দেখছে পুলিশ। প্রাথমিক অ্যালকোহল ও ড্রাগ পরীক্ষার রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে বলে জানা গিয়েছে। তবে তদন্ত সম্পূর্ণ নিশ্চিত করতে রক্তের নমুনা ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
দুর্ঘটনায় ব্যবহৃত অ্যাস্টন মার্টিন গাড়িটিও পুলিশ বাজেয়াপ্ত করেছে। গাড়ির গতি, দুর্ঘটনার পরিস্থিতি এবং চালকের ভূমিকা সম্পর্কে আরও তথ্য পেতে ফরেনসিক ও প্রযুক্তিগত পরীক্ষার সাহায্য নেওয়া হতে পারে।
বিরোধীদের তীব্র আক্রমণ
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলঙ্গানার রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিরোধী YSR কংগ্রেস পার্টি বা YSRCP অভিযোগ করেছে, দুর্ঘটনার পর বেশ কয়েকদিন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।
দলের মুখপাত্র কার্তিক ইয়েল্লাপ্রাগাডা অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু এবং উপমুখ্যমন্ত্রী পবন কল্যাণের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বিরোধীদের অভিযোগ, অভিযুক্তের পরিবারের রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তদন্তে কোনও বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে কি না, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
যদিও এই অভিযোগগুলি রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে করা হয়েছে এবং তা স্বাধীনভাবে প্রমাণিত হয়নি।
‘ভিআইপি প্রিভিলেজ’ নিয়ে প্রশ্ন
ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দুর্ঘটনার পর CCTV ফুটেজ প্রকাশে দেরি এবং অভিযুক্তকে গ্রেফতার না করার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
বিরোধী শিবিরের বক্তব্য, সাধারণ কোনও ব্যক্তি একই ধরনের দুর্ঘটনায় অভিযুক্ত হলে যে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী পরিবারের সদস্যের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম কার্যকর হওয়া উচিত। এই কারণেই পুরো তদন্ত স্বচ্ছভাবে করার দাবি উঠেছে।
পুণের পোর্শে দুর্ঘটনার প্রসঙ্গও টেনে আনছেন অনেকে। প্রভাবশালী পরিবারের সন্তানদের জড়িত থাকা সড়ক দুর্ঘটনায় আইন কতটা সমানভাবে কার্যকর হচ্ছে, সেই প্রশ্নই ফের সামনে এসেছে।
সামনে তদন্তেই পরিষ্কার হবে আসল ঘটনা
এই মুহূর্তে পুলিশের তদন্তে মূল নজর দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ, গাড়ির গতি, চালকের আচরণ, ফরেনসিক রিপোর্ট এবং ঘটনাস্থলের CCTV ফুটেজের দিকে। পাশাপাশি দুর্ঘটনার আগে ও পরে ঠিক কী ঘটেছিল, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
একদিকে সাংসদ-পিতা দাবি করছেন, তাঁর ছেলে তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করছেন এবং আইন মেনেই সবকিছু হচ্ছে। অন্যদিকে বিরোধীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অভিযুক্ত সুবিধা পাচ্ছেন।
ফলে হায়দরাবাদের এই অ্যাস্টন মার্টিন দুর্ঘটনা এখন শুধুমাত্র একটি সড়ক দুর্ঘটনার তদন্তে সীমাবদ্ধ নেই। আইনের চোখে সবাই সমান কি না, রাজনৈতিক পরিচয় তদন্তে কোনও প্রভাব ফেলছে কি না এবং মৃত তরুণীর পরিবার কতটা ন্যায়বিচার পাবে—এই তিন প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছে
