সোমালিয়া-ইয়েমেন উপকূলে ৪ দিনে ২ জাহাজ ছিনতাই, বিপদে ২২ ভারতীয় নাবিক
সোমালিয়া ও ইয়েমেন উপকূলে মাত্র চার দিনের ব্যবধানে দুই বাণিজ্যিক জাহাজ ছিনতাই। দুই জাহাজে থাকা ২২ ভারতীয় নাবিক নিরাপদে, জানাল বিদেশ মন্ত্রক।
সোমালিয়া ও ইয়েমেন উপকূলে ৪ দিনের ব্যবধানে দুই জাহাজ ছিনতাই
নয়াদিল্লি, ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক : সোমালিয়া ও ইয়েমেন উপকূলে মাত্র চার দিনের ব্যবধানে দুটি বাণিজ্যিক জাহাজ ছিনতাইয়ের ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ল আন্তর্জাতিক মহলে। সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয়, ছিনতাই হওয়া দুই জাহাজে মোট ২২ জন ভারতীয় নাবিক ছিলেন। তবে ভারতের বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, দুই জাহাজে থাকা সমস্ত ভারতীয় নাগরিক বর্তমানে নিরাপদে রয়েছেন। পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রেখেছে ভারত।

বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন, ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাঁদের দ্রুত এবং নিরাপদে মুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক যোগাযোগও চালানো হচ্ছে।
১৭ আগস্ট সোমালিয়া উপকূলে প্রথম জাহাজ ছিনতাই
প্রথম ঘটনাটি ঘটে ১৭ আগস্ট ২০২৬। সোমালিয়ার পুন্টল্যান্ড উপকূলের এয়েল জেলার কাছে ছিনতাই করা হয় M/V LUTUF নামে একটি কার্গো জাহাজ।
ক্যামেরুনের পতাকাবাহী এই জাহাজটিতে মোট ১০ জন ক্রু ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ৬ জন ভারতীয় নাবিক। জাহাজটি মোগাদিশুতে তুর্কি সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের উদ্দেশে অস্ত্র, যোগাযোগ সরঞ্জাম এবং স্যাটেলাইট-সংক্রান্ত সরঞ্জাম বহন করছিল বলে জানা গিয়েছে।
AK-47 হাতে জলদস্যুদের হামলা
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, দুটি ছোট নৌকায় করে প্রায় ৮ জন সশস্ত্র জলদস্যু M/V LUTUF-এ হামলা চালায়। তাঁদের হাতে AK-47-এর মতো আগ্নেয়াস্ত্র ছিল বলে জানা গিয়েছে।
আক্রমণের সময় জাহাজের নাবিকরা নিজেদের নিরাপত্তার জন্য জাহাজের সুরক্ষিত অংশ, অর্থাৎ ‘সিটাডেল’-এ আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু জলদস্যুরা শেষ পর্যন্ত সেই সুরক্ষিত এলাকায় প্রবেশ করে জাহাজের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেয়।
ঘটনার পর জাহাজটির গতিবিধি এবং সেখানে থাকা ক্রুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।
২০ আগস্ট ইয়েমেন উপকূলে দ্বিতীয় জাহাজ ছিনতাই
এর মাত্র তিন দিনের মাথায়, ২০ আগস্ট, দ্বিতীয় ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। এবার ইয়েমেন উপকূল থেকে প্রায় ৩০ নটিক্যাল মাইল দূরে, এডেন উপসাগর এলাকায় ছিনতাই করা হয় M.T. SIBU 1 নামে একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার।
ইরিত্রিয়ার পতাকাবাহী এই জাহাজে মোট ২০ জন ক্রু ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ১৬ জন ভারতীয় নাবিক। অভিযোগ, প্রায় ছয়জন সশস্ত্র জলদস্যু জাহাজটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং জাহাজটিকে জোর করে সোমালিয়ার জলসীমার দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে যায়।
ফলে দুই ঘটনায় মোট ২২ জন ভারতীয় নাবিক জলদস্যুদের কবলে পড়লেও বর্তমানে তাঁরা নিরাপদে রয়েছেন বলে জানিয়েছে ভারত সরকার।
M/V LUTUF ঘিরে বিমান হামলার তথ্য
M/V LUTUF ছিনতাইয়ের পর ঘটনাস্থলে নজরদারি শুরু হয় বলে সোমালি কর্মকর্তাদের দাবি। তুরস্কের দুটি জাহাজ এবং ড্রোন দিয়ে ওই এলাকার গতিবিধির উপর নজর রাখা হচ্ছিল বলে জানা গিয়েছে।
এরপর জলদস্যুদের উদ্দেশ্যে একটি ছোট নৌকা থেকে মাদক সরবরাহের ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয় সূত্রে দাবি করা হয়েছে। পরবর্তীতে সেখানে বিমান হামলা চালানো হয়। ওই হামলায় চারজন নিহত এবং দু’জন আহত হয়েছেন বলে সোমালি কর্মকর্তাদের তরফে জানানো হয়েছে।
ঘটনাটির পূর্ণ পরিস্থিতি ও হামলার সঙ্গে ছিনতাই হওয়া জাহাজের সম্পর্ক কী, তা নিয়ে আরও তথ্যের অপেক্ষা রয়েছে।
ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তায় তৎপর দিল্লি
পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে ভারত সরকারও দ্রুত কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে। কেনিয়ায় অবস্থিত ভারতীয় হাইকমিশন সোমালিয়ার স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তা এবং তাঁদের দ্রুত মুক্তির বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরেছে।
ভারতের বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। ভারতীয় নাবিকদের পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং তাঁদের নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য কূটনৈতিক স্তরে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
ফের মাথাচাড়া দিচ্ছে জলদস্যু আতঙ্ক
এক সময় সোমালিয়া উপকূল ও এডেন উপসাগর বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক জলপথ হিসেবে পরিচিত ছিল। আন্তর্জাতিক নৌবাহিনীর নজরদারি এবং বিভিন্ন নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থার কারণে গত কয়েক বছরে জলদস্যুতা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছিল। কিন্তু ফের বাণিজ্যিক জাহাজ ছিনতাইয়ের ঘটনা সামনে আসায় সেই পুরনো আতঙ্ক নতুন করে ফিরে আসছে।
বিশেষ করে ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে ভারতীয় নাবিকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ নাবিক সরবরাহকারী দেশ হওয়ায় সমুদ্রপথে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে তার সরাসরি প্রভাব ভারতীয় সমুদ্রকর্মীদের উপর পড়তে পারে।
নজরে এডেন উপসাগর ও সোমালিয়া উপকূল
পরপর দুটি জাহাজ ছিনতাইয়ের ঘটনায় এখন এডেন উপসাগর, সোমালিয়া উপকূল এবং সংলগ্ন জলপথে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে নজরদারি শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজগুলির নিরাপত্তা বাড়ানো এবং জলদস্যুদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
এই পরিস্থিতিতে ২২ জন ভারতীয় নাবিকের নিরাপত্তা আপাতত স্বস্তির খবর হলেও, তাঁদের দ্রুত এবং নিরাপদে মুক্ত করে দেশে ফেরানোই এখন ভারতের কাছে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক জলপথে জলদস্যুদের ফের সক্রিয় হয়ে ওঠার বিষয়টি নিয়ে সতর্ক হচ্ছে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন সংস্থা।
