ভারতেই তৈরি হবে মার্কিন জ্যাভলিন মিসাইল, টাটার সঙ্গে বড় চুক্তি লকহিড মার্টিন-রেথিয়নের
ভারতে জ্যাভলিন অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক গাইডেড মিসাইলের সহ-উৎপাদনের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে টাটা অ্যাডভান্সড সিস্টেমসের সঙ্গে MoU করল Javelin Joint Venture। তৈরি হতে পারে ফাইনাল অ্যাসেম্বলি ও ইন্টিগ্রেশন সুবিধা।
ভারতেই তৈরি হবে মার্কিন ‘জ্যাভলিন’ অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক গাইডেড মিসাইল
নয়াদিল্লি, ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক ১২ : ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পে আরও এক বড় মাইলফলক। এবার অত্যাধুনিক মার্কিন জ্যাভলিন অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক গাইডেড মিসাইল (ATGM) ভারতে সহ-উৎপাদনের পথে এগোল ভারত ও আমেরিকা। টাটা গোষ্ঠীর প্রতিরক্ষা সংস্থা টাটা অ্যাডভান্সড সিস্টেমস লিমিটেড (TASL)-এর সঙ্গে অংশীদারিত্বে দেশে জ্যাভলিন মিসাইলের চূড়ান্ত সংযোজন ও একীকরণের পরিকাঠামো গড়ে তোলা হবে। এই উদ্যোগ ভারতের ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ এবং প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরতার লক্ষ্যের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

৩১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে মার্কিন প্রতিরক্ষা শিল্পের দুই প্রধান সংস্থা লকহিড মার্টিন ও রেথিয়ন-এর যৌথ উদ্যোগ জ্যাভলিন জয়েন্ট ভেঞ্চার (JJV) এবং টাটা গোষ্ঠীর মধ্যে এই বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক বা MoU স্বাক্ষরিত হয়েছে। চুক্তির ফলে ভবিষ্যতে জ্যাভলিন মিসাইলের কিছু গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন ও সংযোজন প্রক্রিয়া ভারতের মাটিতেই সম্পন্ন করার সুযোগ তৈরি হবে।
ভারতে তৈরি হবে ফাইনাল অ্যাসেম্বলি ও ইন্টিগ্রেশন ফ্যাসিলিটি
চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ভারতে একটি বিশেষ ‘ফাইনাল অ্যাসেম্বলি অ্যান্ড ইন্টিগ্রেশন ফ্যাসিলিটি’ তৈরি করা। এই কারখানায় জ্যাভলিন মিসাইলের সম্পূর্ণ রাউন্ড বা Javelin All Up Round (AUR)-এর চূড়ান্ত সংযোজন করা হবে।
অর্থাৎ, জ্যাভলিনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সাব-অ্যাসেম্বলি ও যন্ত্রাংশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতে আসার পর সেগুলিকে একত্রিত করে সম্পূর্ণ মিসাইল সিস্টেম প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে ভারত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। এর মাধ্যমে দেশের প্রতিরক্ষা উৎপাদন পরিকাঠামো আরও শক্তিশালী হবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলবে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান উৎপাদন
প্রস্তাবিত উৎপাদন কাঠামো অনুযায়ী, জ্যাভলিনের নির্দিষ্ট কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশের উৎপাদন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই অব্যাহত থাকবে। লকহিড মার্টিনের ট্রয় কারখানায় সাব-অ্যাসেম্বলি কিট এবং রেথিয়নের টুকসন কারখানায় গাইডেন্স ইলেকট্রনিক্স ইউনিট তৈরি করা হবে।
এরপর সেই উপাদানগুলি ভারতে পাঠানো হবে। ভারতে টাটার পরিকাঠামোতে সেগুলির চূড়ান্ত সংযোজন এবং ইন্টিগ্রেশন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে ভারতীয় শিল্প সংস্থা এবং মার্কিন প্রতিরক্ষা শিল্পের মধ্যে সরবরাহ ও উৎপাদন সহযোগিতার একটি নতুন মডেল তৈরি হতে পারে।
একাধিক সংস্থার মধ্যে টাটাকেই বেছে নিল মার্কিন সংস্থা
এই প্রকল্পের জন্য ভারতের একাধিক প্রতিরক্ষা সংস্থার সক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা পর্যালোচনা করা হয়েছিল। সেই মূল্যায়নের পর টাটা অ্যাডভান্সড সিস্টেমসকে প্রধান অংশীদার বা Prime Partner হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে।
প্রতিরক্ষা উৎপাদন, বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরির ক্ষেত্রে টাটার অভিজ্ঞতাই এই নির্বাচনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
চুক্তির মাত্র তিন দিন আগেই জ্যাভলিন কেনার সিদ্ধান্ত
জ্যাভলিন নিয়ে ভারত-মার্কিন প্রতিরক্ষা সহযোগিতার গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়েছে এর ঠিক কয়েক দিন আগেই। ২৮ আগস্ট ২০২৬, অর্থাৎ MoU স্বাক্ষরের মাত্র তিন দিন আগে, ভারতীয় সেনাবাহিনী জরুরি ক্রয় ক্ষমতার আওতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রায় ১০০টি জ্যাভলিন মিসাইল সিস্টেম কেনার জন্য সরাসরি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল।
এই চুক্তির আর্থিক মূল্য প্রায় ২৯২ কোটি টাকা বলে জানা গিয়েছে। সেনাবাহিনীর জরুরি প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতে দেশে এই ধরনের অত্যাধুনিক অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক অস্ত্রের উৎপাদন ও সংযোজনের পথও এই নতুন চুক্তির মাধ্যমে আরও প্রশস্ত হচ্ছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ জ্যাভলিন মিসাইল?
জ্যাভলিন একটি বহুল ব্যবহৃত অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক গাইডেড মিসাইল সিস্টেম, যা সাঁজোয়া যান ও ট্যাঙ্ক মোকাবিলায় ব্যবহারের জন্য তৈরি। এর উন্নত গাইডেন্স ব্যবস্থা এবং ‘ফায়ার অ্যান্ড ফরগেট’ ধরনের সক্ষমতা এটিকে আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র ব্যবস্থায় পরিণত করেছে।
ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে এই ধরনের অত্যাধুনিক ব্যবস্থা যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি দেশে এর চূড়ান্ত সংযোজনের সক্ষমতা তৈরি হলে ভবিষ্যতে রক্ষণাবেক্ষণ, সরবরাহ এবং উৎপাদন ব্যবস্থায়ও সুবিধা পাওয়া যেতে পারে।
ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পে কী লাভ হবে?
টাটা অ্যাডভান্সড সিস্টেমসের সিইও সুকরণ সিং-এর বক্তব্য অনুযায়ী, এই উদ্যোগের মাধ্যমে ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ মিসাইল অ্যাসেম্বলি প্রযুক্তি এবং সংশ্লিষ্ট জ্ঞান স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি হবে।
এর ফলে শুধু সেনাবাহিনীর অস্ত্রভাণ্ডার শক্তিশালী হওয়াই নয়, দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পে দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও বাড়বে। একই সঙ্গে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আরও বড় বিষয় হল, ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদন ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে। ভবিষ্যতে ভারতীয় কারখানাগুলি শুধু দেশের চাহিদা পূরণেই নয়, আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা সরবরাহ ব্যবস্থার অংশ হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
‘মেক ইন ইন্ডিয়া’র পথে আরও এক ধাপ
বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্যাভলিনের মতো উন্নত বিদেশি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার চূড়ান্ত সংযোজন ও ইন্টিগ্রেশন ভারতে হওয়ার সিদ্ধান্ত দেশের প্রতিরক্ষা উৎপাদন ক্ষেত্রের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এর মাধ্যমে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে ভারতীয় শিল্পের প্রত্যক্ষ সংযোগ তৈরি হচ্ছে।
ভারত গত কয়েক বছরে বিদেশি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম আমদানির পাশাপাশি দেশে উৎপাদন বাড়ানোর উপর জোর দিয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় টাটা ও জ্যাভলিন জয়েন্ট ভেঞ্চারের এই অংশীদারিত্বকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, জ্যাভলিন মিসাইলের ভারতে সহ-উৎপাদন ও চূড়ান্ত সংযোজনের পরিকল্পনা ভারত-মার্কিন প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে নতুন মাত্রা দিতে পারে। একদিকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্য অত্যাধুনিক অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক সক্ষমতা বাড়বে, অন্যদিকে দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পে প্রযুক্তি, দক্ষতা, কর্মসংস্থান এবং আন্তর্জাতিক উৎপাদন সংযোগ—সব ক্ষেত্রেই নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলতে পারে।
