সিন্ধু জল চুক্তি নিয়ে হেগের রায়, ভারতের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান নয়াদিল্লির
সিন্ধু জল চুক্তি নিয়ে হেগের স্থায়ী সালিসি আদালতের রায় প্রত্যাখ্যান করল ভারত। আদালতের এখতিয়ার নিয়ে আপত্তি নয়াদিল্লির, চুক্তি স্থগিত রাখার অবস্থানও বহাল।
সিন্ধু জল চুক্তি নিয়ে হেগের সালিসি আদালতের রায় গেল – ভারতের বিরুদ্ধে

সিটি নিউজ বাংলা, নয়াদিল্লি, ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক ৩ : ১৯৬০ সালের সিন্ধু জল চুক্তি নিয়ে হেগের স্থায়ী সালিসি আদালতের (Permanent Court of Arbitration) রায় ও নির্দেশ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করল ভারত। নয়াদিল্লির স্পষ্ট বক্তব্য, এই মামলায় সিদ্ধান্ত দেওয়ার মতো কোনও বৈধ আইনি এখতিয়ার ওই সালিসি আদালতের নেই। ফলে আদালতের রায়কে ভারত গ্রহণ করছে না এবং চুক্তি সংক্রান্ত নিজেদের অবস্থানও অপরিবর্তিত রাখছে।
ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছে, সিন্ধু জল চুক্তি নিয়ে যে সালিসি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তার বৈধতা ভারত প্রথম থেকেই অস্বীকার করে আসছে। নয়াদিল্লির দাবি, ওই সালিসি আদালত এমন একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গঠিত হয়েছে যার কোনও বৈধ আইনি ভিত্তি নেই। তাই আদালতের কোনও রায় বা নির্দেশ ভারতের কাছে বাধ্যতামূলক নয়।
সালিসি আদালতের গঠন নিয়েই ভারতের আপত্তি
ভারতের প্রধান আপত্তি আদালতের গঠন ও এখতিয়ার নিয়ে। নয়াদিল্লির বক্তব্য, সিন্ধু জল চুক্তি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য হেগে যে সালিসি আদালত গঠন করা হয়েছে, তার বৈধতা ভারত কখনও স্বীকার করেনি।
ভারত মনে করছে, চুক্তিতে নির্ধারিত ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে গঠিত এই ধরনের সালিসি প্রক্রিয়া গ্রহণযোগ্য নয়। সেই কারণে শুরু থেকেই এই ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রমে অংশ নেওয়া বা তার সিদ্ধান্তকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রশ্নে আপত্তি জানিয়ে এসেছে নয়াদিল্লি।
‘চুক্তি আপাতত স্থগিতই থাকবে’, স্পষ্ট বার্তা ভারতের
সিন্ধু জল চুক্তি নিয়ে ভারতের অবস্থানও এদিন আরও একবার স্পষ্ট করা হয়েছে। নয়াদিল্লির বক্তব্য, সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত ১৯৬০ সালের সিন্ধু জল চুক্তি ‘স্থগিত’ বা ‘in abeyance’ রাখার সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে।
ভারতের যুক্তি, দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌম স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে নিজস্ব অবস্থান থেকে। কোনও আন্তর্জাতিক সালিসি সংস্থা এই সার্বভৌম সিদ্ধান্তের ওপর হস্তক্ষেপ করতে পারে না বলেই মনে করছে ভারত।
কী বলেছে হেগের সালিসি আদালত?
অন্যদিকে, হেগের সালিসি আদালতের রায়ে বলা হয়েছিল, ভারত একতরফাভাবে সিন্ধু জল চুক্তির কার্যকারিতা স্থগিত রাখতে পারে না। আদালতের বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৬০ সালের জলবণ্টন চুক্তি এখনও কার্যকর রয়েছে এবং চুক্তির আওতায় থাকা বিষয়গুলিতে নির্ধারিত প্রক্রিয়াই অনুসরণ করতে হবে।
এছাড়াও রতলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প-সহ কয়েকটি বিষয়ে আদালতের তরফে অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে ভারতের পক্ষ থেকে সেই রায় ও নির্দেশ সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।
ভারত-পাকিস্তান জলবণ্টন প্রশ্নে ফের উত্তেজনা
সিন্ধু জল চুক্তি দীর্ঘদিন ধরে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে জলবণ্টন সংক্রান্ত সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। চুক্তি অনুযায়ী সিন্ধু নদী ব্যবস্থার পূর্ব ও পশ্চিম নদীগুলির জল ব্যবহারের বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে নির্দিষ্ট কাঠামো তৈরি হয়েছিল।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের অবনতির পাশাপাশি চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে ভারত চুক্তি স্থগিত রাখার অবস্থান নিয়েছে।
ভারতের অবস্থান কতটা কঠোর?
নয়াদিল্লির সাম্প্রতিক অবস্থান থেকে স্পষ্ট, সিন্ধু জল চুক্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক কোনও সালিসি সিদ্ধান্তকে আপাতত গ্রহণ করার পথে হাঁটছে না ভারত। বরং চুক্তির বৈধতা ও কার্যকারিতা নিয়ে নিজেদের সিদ্ধান্তকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে কেন্দ্র।
ভারতের বক্তব্য, দেশের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে নেওয়া সিদ্ধান্তে কোনও এমন প্রতিষ্ঠানের হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়, যার আইনি এখতিয়ারই ভারত স্বীকার করে না।
ফলে হেগের সালিসি আদালতের রায় ঘিরে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন আরও বাড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। সিন্ধু জল চুক্তির ভবিষ্যৎ এবং দুই দেশের মধ্যে জলসম্পদ নিয়ে সম্পর্ক কোন দিকে এগোয়, এখন সেদিকেই নজর আন্তর্জাতিক মহলের।
