এপ্রিল-জুনে ভারতের GDP প্রবৃদ্ধি ৭.৮%, অর্থনীতির শক্তি নিয়ে মোদীর প্রশংসা
এপ্রিল-জুন ত্রৈমাসিকে ভারতের GDP প্রবৃদ্ধি ৭.৮%। অর্থনীতির শক্তি ও স্থিতিস্থাপকতার প্রশংসা প্রধানমন্ত্রী মোদীর। প্রবৃদ্ধির সুফল নিয়ে প্রশ্ন কংগ্রেসের।
এপ্রিল-জুনে ভারতের GDP প্রবৃদ্ধি ৭.৮%, অর্থনীতির শক্তি নিয়ে মোদীর প্রশংসা

নয়াদিল্লি, ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক ১১ : বিশ্ব অর্থনীতিতে যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার নানা সংকটের মধ্যেও ভারতের অর্থনীতি শক্তিশালী গতিতে এগিয়ে চলেছে। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিক, অর্থাৎ এপ্রিল থেকে জুনে দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা GDP প্রবৃদ্ধির হার ৭.৮ শতাংশে পৌঁছেছে। এই পরিসংখ্যানকে কেন্দ্র করে একদিকে যেমন কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে ভারতের অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতার প্রশংসা করা হয়েছে, অন্যদিকে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই প্রবৃদ্ধিকে ভারতের অর্থনীতির শক্তি ও সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য, বিশ্বজুড়ে একাধিক চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও ভারতের অর্থনীতি যে গতিতে এগিয়ে চলেছে, তা দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি কতটা শক্তিশালী হয়েছে তারই প্রমাণ।
প্রধানমন্ত্রী এই সাফল্যকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করে এর জন্য দেশের সাধারণ মানুষ, শিল্পমহল, কৃষক, শ্রমিক এবং উদ্যোক্তাদের অবদানকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক স্তরে যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তা এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বাধার মতো পরিস্থিতির মধ্যেও ভারতের ৭.৮ শতাংশ GDP বৃদ্ধি একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন।
‘হারকিউলিয়ান ফেট’ বলে প্রশংসা প্রধানমন্ত্রীর
ভারতের এই অর্থনৈতিক পারফরম্যান্সকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী কার্যত একটি বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছেন। প্রতিকূল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির মধ্যে এই প্রবৃদ্ধিকে তিনি ‘হারকিউলিয়ান ফেট’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। অর্থাৎ, নানা বাধা ও চাপের মধ্যেও ভারত যে অর্থনৈতিক শক্তি ধরে রাখতে পেরেছে, সেটিকে তিনি অসাধারণ সক্ষমতার নিদর্শন হিসেবে দেখছেন।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে আত্মনির্ভর ভারতের প্রসঙ্গ। তাঁর মতে, এই অগ্রগতির ধারাকে আরও শক্তিশালী করতে হলে দেশের উৎপাদন ক্ষমতা, দেশীয় শিল্প, প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনের ওপর জোর দিতে হবে। একইসঙ্গে ‘বিকশিত ভারত’-এর লক্ষ্য পূরণে স্বদেশী ও আত্মনির্ভরতার পথে আরও এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
নেতিবাচক প্রচারের বিরুদ্ধেও সরব মোদী
দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিয়ে যারা নেতিবাচক মন্তব্য করছেন, তাঁদেরও সমালোচনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর, ভারতের অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র বুঝতে হলে সামগ্রিক পরিসংখ্যান এবং দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
কেন্দ্রের দাবি, আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে নানা অনিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও ভারতীয় অর্থনীতি যে স্থিতিস্থাপকতা দেখাচ্ছে, তা ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করছে।
GDP বৃদ্ধির পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন কংগ্রেসের
তবে সরকারের এই ব্যাখ্যা মানতে নারাজ কংগ্রেস। বিরোধী দলের দাবি, ৭.৮ শতাংশ GDP প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানকে সামনে রেখে দেশের সাধারণ মানুষের বাস্তব পরিস্থিতিকে আড়াল করা হচ্ছে। কংগ্রেসের প্রশ্ন, যদি অর্থনীতি এত দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে থাকে, তাহলে তার সুফল কর্মসংস্থান, আয় এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় আরও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না কেন?
কংগ্রেসের নেতাদের বক্তব্য, শুধু GDP বৃদ্ধির হার দিয়ে দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতার সম্পূর্ণ ছবি পাওয়া যায় না। GDP মূলত একটি নির্দিষ্ট সময়ে দেশে উৎপাদিত পণ্য ও পরিষেবার মোট আর্থিক মূল্য পরিমাপ করে। কিন্তু এর মাধ্যমে প্রত্যেক মানুষের আয়, চাকরির সুযোগ, মজুরি বৃদ্ধি কিংবা সম্পদের বণ্টন কতটা সমান হচ্ছে—সেই বিষয়গুলি সরাসরি বোঝা যায় না।
বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি ও সঞ্চয় নিয়েও বিরোধীদের প্রশ্ন
কংগ্রেস বিশেষভাবে শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে বেকারত্বের বিষয়টি সামনে এনেছে। তাদের বক্তব্য, অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি পর্যাপ্ত মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি না হলে সেই প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের বৃহত্তর অংশের কাছে পৌঁছনো কঠিন।
এর পাশাপাশি মূল্যবৃদ্ধি এবং সাধারণ পরিবারের সঞ্চয় কমে যাওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেছে কংগ্রেস। বিরোধী দলের মতে, মানুষের হাতে যদি পর্যাপ্ত অর্থ না থাকে এবং পরিবারের সঞ্চয়ের ক্ষমতা কমতে থাকে, তাহলে শুধুমাত্র GDP বৃদ্ধির পরিসংখ্যান দিয়ে অর্থনীতির স্বাস্থ্য বিচার করা যথেষ্ট নয়।
উন্নয়ন বনাম বাস্তব জীবনের প্রশ্ন
ফলে ৭.৮ শতাংশ GDP প্রবৃদ্ধিকে ঘিরে কেন্দ্র ও বিরোধীদের মধ্যে নতুন করে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কেন্দ্র যেখানে এই পরিসংখ্যানকে ভারতের অর্থনীতির শক্তি, স্থিতিস্থাপকতা এবং আত্মনির্ভরতার অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরছে, সেখানে কংগ্রেসের প্রশ্ন—এই প্রবৃদ্ধির বাস্তব সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা পৌঁছেছে?
অর্থনীতির এই দুই ভিন্ন ব্যাখ্যার মধ্যে আগামী দিনে কর্মসংস্থান, আয়, মূল্যবৃদ্ধি, ভোগব্যয় এবং সাধারণ পরিবারের আর্থিক অবস্থার মতো সূচকগুলি বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে। ভারতের অর্থনীতি উচ্চ প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখতে পারে কি না এবং সেই প্রবৃদ্ধি সমাজের সব স্তরের মানুষের জীবনযাত্রায় কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনে, এখন সেদিকেই নজর অর্থনৈতিক মহলের।
