চিনির দামে আগুন! কলকাতায় কেজি ৭০ টাকা, পুজোর আগে বাড়ছে মিষ্টির দাম
দুর্গাপুজোর আগে কলকাতায় চিনির দাম বেড়ে কেজি ৭০ টাকা। উৎপাদন ঘাটতি, চাহিদা বৃদ্ধি ও মজুতদারির অভিযোগে বাজারে অস্থিরতা। কেন্দ্রের পদক্ষেপে কমবে কি দাম?
চিনির দামে আগুন! কলকাতায় কেজি ৭০ টাকা
সিটি নিউজ বাংলা, ন্যাশনাল ডেস্ক : দুর্গাপুজোর আগে বাংলার বাজারে বড় ধাক্কা। রান্নাঘর থেকে মিষ্টির দোকান—চিনির দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে সর্বত্র। গত এক মাসে কলকাতার খুচরো বাজারে চিনির দাম কেজি প্রতি প্রায় ৪৮-৫৩ টাকা থেকে বেড়ে ৬৫ থেকে ৭০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে বলে ব্যবসায়ীদের দাবি। উৎসবের মরসুম সামনে থাকায় এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব আরও ব্যাপক হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

চিনির দাম বৃদ্ধির জেরে একদিকে যেমন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের মাসিক বাজারের খরচ বাড়ছে, তেমনই সমস্যায় পড়েছেন মিষ্টি ব্যবসায়ীরাও। রসগোল্লা, সন্দেশ, ক্ষীর, চমচম থেকে শুরু করে বাতাসা, নকুলদানা এবং বিভিন্ন পুজোর সামগ্রী তৈরিতে চিনির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ফলে কাঁচামালের দাম বাড়ায় আগামী দিনে মিষ্টির দামও বাড়তে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন ব্যবসায়ীদের একাংশ।
কেন এতটা বাড়ল চিনির দাম?
বাজার বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীদের মতে, চিনির বাজারে বর্তমান অস্থিরতার পিছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। দেশের কয়েকটি প্রধান আখ উৎপাদনকারী রাজ্যে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে আখের ফলন কমেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে চিনি উৎপাদনে।
দেশের চিনি উৎপাদনের প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা যেখানে প্রায় ৩৪৩ লক্ষ মেট্রিক টন ধরা হয়েছিল, উৎপাদন কমে প্রায় ৩০৬ লক্ষ মেট্রিক টন-এ নেমে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি। ফলে বাজারে সরবরাহের উপর চাপ তৈরি হয়েছে।
ইথানল নীতি নিয়ে বিতর্ক
চিনির দাম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে আসছে ইথানল উৎপাদনের বিষয়টিও। পেট্রোলে ইথানল মেশানোর নীতির ফলে আখ ও আখজাত উপাদানের একটি অংশ ইথানল উৎপাদনে ব্যবহার করা হচ্ছে। এর ফলে ভোজ্য চিনি তৈরির জন্য উপলব্ধ কাঁচামালের পরিমাণ কমছে—এমন অভিযোগ করেছেন বাজারের একাংশ।
বিশেষ করে E20 পেট্রোল, অর্থাৎ ২০ শতাংশ ইথানল মিশ্রিত পেট্রোলের লক্ষ্যমাত্রা পূরণকে কেন্দ্র করে আখভিত্তিক ইথানল উৎপাদন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে চিনির দাম বৃদ্ধির জন্য শুধুমাত্র ইথানল নীতিকেই দায়ী করা ঠিক নয় বলে পাল্টা যুক্তি দিয়েছে কেন্দ্র।
কেন্দ্রের দাবি, ইথানল নয় মূল সমস্যা উৎপাদন ঘাটতি
চিনির দাম বৃদ্ধি নিয়ে বিতর্কের মধ্যে কেন্দ্রীয় উপভোক্তা বিষয়ক মন্ত্রকের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, শুধুমাত্র ইথানল নীতির কারণে চিনির দাম বাড়ছে—এমন দাবি সঠিক নয়।
সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৫-২৬ মরসুমে ইথানল উৎপাদনে চিনির ব্যবহার বরং কমেছে। প্রায় ১২ শতাংশ থেকে তা নেমে এসেছে ৯ শতাংশের কাছাকাছি।
এছাড়া বর্তমানে দেশের মোট ইথানল উৎপাদনের বড় অংশই আখের পরিবর্তে শস্যজাত কাঁচামাল, যেমন ভুট্টা ও ভাঙা চাল থেকে তৈরি হচ্ছে বলে কেন্দ্রের তরফে জানানো হয়েছে। ফলে বর্তমান চিনির বাজারের অস্থিরতার জন্য খারাপ আবহাওয়ার কারণে উৎপাদন কমে যাওয়া, উৎসবের মরসুমে চাহিদা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় স্তরে মজুতদারির মতো বিষয়গুলিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মজুতদারির অভিযোগ ঘিরেও বাড়ছে চাপ
চিনির দাম বৃদ্ধির ক্ষেত্রে মজুতদারির অভিযোগও সামনে এসেছে। পশ্চিমবঙ্গের ব্যবসায়ী মহলের একাংশের দাবি, উৎসবের মরসুমের আগে বাজারে চাহিদা বাড়ার সুযোগ নিয়ে কিছু পাইকারি ব্যবসায়ী ও মিল মালিক অতিরিক্ত চিনি মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন।
তবে এই অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের জন্য প্রশাসনিক নজরদারি ও তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে। বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে মজুতের সীমা নিয়েও কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বাজার নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রের একাধিক পদক্ষেপ
চিনির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে দেশের বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্র। দীর্ঘ সময় পর প্রায় ১০ লক্ষ মেট্রিক টন চিনি শুল্কমুক্ত আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। এর ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ বাড়বে এবং দামের উপর চাপ কিছুটা কমতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের মজুতের ক্ষেত্রেও সীমা বজায় রাখা হয়েছে। খুচরো ও পাইকারি ডিলারদের জন্য সর্বোচ্চ ৪০০ টন স্টক লিমিট নির্ধারণ করা হয়েছে।
বড় বাণিজ্যিক ব্যবহারকারী—যেমন মিষ্টি, বিস্কুট ও অন্যান্য খাদ্য উৎপাদনকারী সংস্থাগুলির ক্ষেত্রেও মজুত নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ১ সেপ্টেম্বর থেকে নির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী ১৫ দিনের বেশি চিনি মজুত রাখার উপর বিধিনিষেধ কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে।
নতুন চিনি দ্রুত বাজারে আনতে আখ মাড়াই এগিয়ে আনার উদ্যোগ
বাজারে সরবরাহের ঘাটতি কাটাতে চিনিকলগুলিকে দ্রুত নতুন মরসুমের আখ মাড়াই শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ১৫ অক্টোবর থেকেই আখ মাড়াই শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে নতুন উৎপাদিত চিনি দ্রুত বাজারে আনা সম্ভব হয়।
সরকারের এই পদক্ষেপ কার্যকর হলে অক্টোবরের মধ্যেই বাজারে নতুন চিনি আসতে শুরু করতে পারে। তাতে সরবরাহ বাড়লে বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির চাপ কিছুটা কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
দুর্গাপুজোর আগে মিষ্টির বাজারে বড় ধাক্কার আশঙ্কা
বাংলার উৎসবের সঙ্গে মিষ্টির সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। দুর্গাপুজো থেকে লক্ষ্মীপুজো, কালীপুজো থেকে ভাইফোঁটা—প্রায় প্রতিটি উৎসবেই মিষ্টির চাহিদা বাড়ে। সেই সময়েই চিনির দাম ৭০ টাকা কেজি পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ায় মিষ্টি ব্যবসায়ীদের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, কাঁচামালের দাম এভাবে বাড়তে থাকলে মিষ্টির বর্তমান দাম ধরে রাখা কঠিন হবে। সেক্ষেত্রে রসগোল্লা, সন্দেশ, ক্ষীরকদম, চমচমসহ বিভিন্ন মিষ্টির দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে দোকান মালিকদের।
শুধু মিষ্টির দোকান নয়, বাড়িতে পুজোর জন্য বাতাসা, নকুলদানা বা অন্যান্য চিনি-নির্ভর সামগ্রী কেনার ক্ষেত্রেও সাধারণ মানুষের অতিরিক্ত খরচ হতে পারে।
উৎসবের আগে স্বস্তি ফিরবে কি?
চিনির দাম আগামী দিনে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে বাজারে সরবরাহ, আমদানি করা চিনির প্রবাহ, নতুন মরসুমের আখ মাড়াই এবং মজুতদারি নিয়ন্ত্রণের উপর। সরকারের পদক্ষেপে যদি দ্রুত বাজারে অতিরিক্ত চিনি পৌঁছয় এবং নতুন উৎপাদন শুরু হয়, তাহলে দাম কিছুটা কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে দুর্গাপুজোর আগে চিনির বাজারে বর্তমান অস্থিরতা সাধারণ মানুষের পাশাপাশি মিষ্টি ব্যবসায়ীদের জন্যও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উৎসবের মরসুমে বাংলার মিষ্টির দাম শেষ পর্যন্ত কতটা বাড়ে, এখন সেদিকেই নজর সাধারণ মানুষের।
