সিকিমে ৪০৭টি ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহ হ্রদ, হড়পা বান নিয়ে উত্তরবঙ্গে উদ্বেগ
সিকিমে ৪০৭টি ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহ হ্রদ ঘিরে বাড়ছে GLOF-এর আশঙ্কা। হিমবাহ গলে জলস্তর বৃদ্ধি ও প্রাকৃতিক বাঁধ ভাঙলে তিস্তা অববাহিকা ধরে উত্তরবঙ্গেও বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা।
সিকিমে ৪০৭টি ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহ হ্রদ! হড়পা বান নিয়ে উত্তরবঙ্গেও বাড়ছে উদ্বেগ

নিজস্ব সংবাদদাতা, সিটি নিউজ বাংলা, এনভায়রনমেন্ট ডেস্ক ৮ :
জলবায়ু পরিবর্তন ও বিশ্ব উষ্ণায়নের জেরে দ্রুত বদলে যাচ্ছে হিমালয়ের পরিবেশ। আর সেই পরিবর্তনের অন্যতম বড় বিপদ হিসেবে সামনে আসছে হিমবাহ গলে তৈরি হওয়া হ্রদ। সিকিম ও সংলগ্ন হিমালয় অঞ্চলে এমনই ৪০৭টি ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহ হ্রদ নিয়ে বড় ধরনের সতর্কতা তৈরি হয়েছে। হিমবাহের বরফ দ্রুত গলে যাওয়া এবং সেই জল জমে নতুন নতুন হ্রদ তৈরি হওয়ায় আগামী দিনে আকস্মিক বন্যা বা গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড (GLOF)-এর আশঙ্কা বাড়ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।
হিমালয়ের উচ্চ পার্বত্য এলাকায় থাকা এই হ্রদগুলির অনেকগুলির চারপাশে রয়েছে বরফ, পাথর, নুড়ি ও মাটির তৈরি প্রাকৃতিক বাঁধ। দীর্ঘদিন ধরে হিমবাহ গলে জল বাড়তে থাকলে এই প্রাকৃতিক বাঁধগুলির উপর চাপও বৃদ্ধি পায়। কোনও কারণে সেই বাঁধ ভেঙে গেলে অতি অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ জল ও পাথর-নুড়ি নিচের দিকে ধেয়ে আসতে পারে। এর ফলেই তৈরি হতে পারে বিধ্বংসী হড়পা বান।
কেন বাড়ছে হিমবাহ হ্রদের ঝুঁকি?
বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাবে হিমালয়ের একাধিক হিমবাহ দ্রুত পিছিয়ে যাচ্ছে। বরফ গলে তৈরি হচ্ছে নতুন জলাধার, আবার পুরনো হিমবাহ হ্রদগুলির জলস্তরও বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে পাহাড়ি এলাকায় প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আবহাওয়ার পরিবর্তন। পাহাড়ি এলাকায় অল্প সময়ের মধ্যে অতিরিক্ত বৃষ্টি, মেঘভাঙা বৃষ্টি কিংবা ভূমিধসের মতো ঘটনা ঘটলে হিমবাহ হ্রদের উপর আচমকা অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে। সেই চাপ সামলাতে না পারলে হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গিয়ে নেমে আসতে পারে বিপুল জলরাশি।
GLOF-এর ক্ষেত্রে শুধু জল নয়, তার সঙ্গে পাথর, বালি, কাদা, বরফ এবং অন্যান্য ধ্বংসাবশেষও প্রবল গতিতে নেমে আসে। ফলে নদী অববাহিকার বিস্তীর্ণ এলাকায় অল্প সময়ের মধ্যে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা থাকে।
সিকিমে বিশেষ নজরদারি
সিকিমের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। রাজ্যের উচ্চ পার্বত্য এলাকায় একাধিক সংবেদনশীল হিমবাহ হ্রদ রয়েছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে সিকিম স্টেট ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি (SDMA)-সহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক সংস্থাগুলি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলির উপর নজরদারি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
হিমবাহ হ্রদগুলির জলস্তর, বাঁধের স্থায়িত্ব এবং আশপাশের ভৌগোলিক পরিবর্তন নিয়মিত পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি সম্ভাব্য বিপদের ক্ষেত্রে দ্রুত সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সিকিমে বিপর্যয় হলে প্রভাব পড়তে পারে উত্তরবঙ্গেও
সিকিমে কোনও বড় হিমবাহ হ্রদ ফেটে গেলে তার প্রভাব শুধু পাহাড়ি রাজ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। জল ও ধ্বংসাবশেষ তিস্তা নদীর অববাহিকা ধরে দ্রুত নিচের দিকে নেমে আসতে পারে। সেক্ষেত্রে দার্জিলিং, কালিম্পং এবং তিস্তা অববাহিকা সংলগ্ন উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
তিস্তা নদীর সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন জনপদ, সড়ক, সেতু, নদী তীরবর্তী বসতি এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোর উপর আকস্মিক জলস্রোত ও ডেব্রিসের বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে সিকিমের হিমবাহ হ্রদগুলির পরিস্থিতির উপর উত্তরবঙ্গের প্রশাসনের কাছেও নজর রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আগাম সতর্কবার্তাই এখন বড় হাতিয়ার
প্রাকৃতিক বিপর্যয় পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব না হলেও তার ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সেই কারণেই উচ্চঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহ হ্রদগুলিতে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, জলস্তর পরিমাপ এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির দ্রুত মূল্যায়নের পাশাপাশি Early Warning System আরও শক্তিশালী করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
কোনও হ্রদের জলস্তর বিপজ্জনকভাবে বেড়ে গেলে কিংবা প্রাকৃতিক বাঁধে পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও নদী অববাহিকার নিচু এলাকার মানুষকে সতর্ক করা গেলে প্রাণহানি ও সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
নেপাল ও তিব্বত সীমান্ত সংলগ্ন হিমালয় অঞ্চলে সাম্প্রতিক হিমবাহ-সংক্রান্ত বিপর্যয়ের ঘটনাগুলির পর ভারতের পাহাড়ি রাজ্যগুলিতেও এই ধরনের ঝুঁকি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ফলে সিকিম থেকে উত্তরবঙ্গ—পুরো তিস্তা অববাহিকাতেই নজরদারি ও বিপর্যয় মোকাবিলার প্রস্তুতি আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
সব মিলিয়ে, ৪০৭টি ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহ হ্রদকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই সতর্কতা শুধু সিকিমের জন্য নয়, তিস্তা অববাহিকা সংলগ্ন উত্তরবঙ্গের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হিমালয়ের ভৌগোলিক ভারসাম্য যত বদলাবে, ততই বাড়তে পারে এই ধরনের আকস্মিক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা। তাই বিপর্যয় আসার অপেক্ষা না করে আগাম নজরদারি, দ্রুত সতর্কবার্তা এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতিকেই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার দাবি উঠছে।
